
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ১৯টি বিভাগের মধ্যে ছয়টি বিভাগ বর্তমানে অধ্যাপকশূন্য। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিভিন্ন সংকট নিয়ে চলা বিশ্ববিদ্যালয়টির এই বিভাগগুলোতে অধ্যাপক না থাকায় শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক নেতৃত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অধ্যাপকহীন বিভাগগুলো হলো—আইন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, নৃবিজ্ঞান এবং ফার্মেসি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৬০টি। এর মধ্যে অধ্যাপকের পদ ৭২টি, সহযোগী অধ্যাপকের ১২৬টি, সহকারী অধ্যাপকের ১৯৫টি এবং প্রভাষকের পদ ২৬৭টি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ছাড়কৃত পদের সংখ্যা ২৭৪টি। এর মধ্যে অধ্যাপকের পদ ১৭টি, সহযোগী অধ্যাপকের ৩৬টি, সহকারী অধ্যাপকের ৯৩টি এবং প্রভাষকের ১২৮টি। এর বিপরীতে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২৮৬ জন। তাদের মধ্যে অধ্যাপক ৬০ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৬৯ জন, সহকারী অধ্যাপক ১১৮ জন এবং প্রভাষক ৩৯ জন। বর্তমানে ৬০ জন অধ্যাপক থাকলেও উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে তিনজন ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে কার্যত অধ্যাপক আছেন ৫৭ জন। এ সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের প্রায় ২১ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোয় অধ্যাপক সর্বোচ্চ শিক্ষক পদ। বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা, গবেষণার পরিবেশ তৈরি, নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, উচ্চতর গবেষণায় তত্ত্বাবধান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অধ্যাপকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে অধ্যাপক না থাকায় এসব বিভাগের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন সহযোগী অধ্যাপক বা অন্যান্য জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা। আবার অনেক বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকেরও সংকট রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের গবেষণা, থিসিস ও নিয়মিত পাঠদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক শিক্ষকের ডক্টরেট ডিগ্রিও নেই। এতে উচ্চতর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কোর্সগুলোতে মানসম্মত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অধ্যাপকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিভাগে অধ্যাপক না থাকাটা একটি সংকট।’ তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক নিয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক লেকচারার নিয়োগ দেওয়াও জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের বিভাগে আটটি ব্যাচ চলমান। এর মধ্যেই শিক্ষক সংকট রয়েছে।’
অধ্যাপক না থাকায় গবেষণা, থিসিস ও একাডেমিক দিকনির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী রকিব আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিভাগে বর্তমানে ১১টি ব্যাচের বিপরীতে আটজন শিক্ষক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে আরও পাঁচজন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে আছেন। তবে মূল সমস্যা হলো, বিভাগে এখন কোনো অধ্যাপক নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক আছেন। তবে একজন অধ্যাপক থাকলে গবেষণা, থিসিস, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি এবং বিভাগের একাডেমিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে আমরা আরও ভালোভাবে সহযোগিতা পেতাম।’
অধ্যাপক সংকটের পাশাপাশি আইন বিভাগে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট। এ বিষয়ে আইন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর ভৌমিক বলেন, ‘আমাদের বিভাগে আগে আটজন শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে চারজন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে থাকায় কার্যকর শিক্ষকের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। আরও একজন শিক্ষকের ছুটি মঞ্জুরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেটি হলে বিভাগে মাত্র তিনজন শিক্ষক থাকবেন।’ তিনি বলেন, ‘যারা বর্তমানে আছেন, তাদের মধ্যে কোনো অধ্যাপক নেই। অথচ স্নাতকোত্তরসহ মোট ছয়-সাতটি ব্যাচের কার্যক্রম চলছে। মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে এতগুলো ব্যাচের ক্লাস ও পরীক্ষা চালানো অসম্ভব। এতে আমরা মারাত্মক সেশনজটের মুখে পড়ছি।’
ফার্মেসি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী অধ্যাপকের পদ থাকলেও আমাদের বিভাগ বর্তমানে অধ্যাপকশূন্য। পাশাপাশি শিক্ষক সংকটও রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। প্রশাসন এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হবে।’
সিএসই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ বলেন, ‘বিভাগে অধ্যাপক থাকা অবশ্যই উচিত। এটি শিক্ষার্থীদের জন্যও ভালো। আমাদের বিভাগে অধ্যাপকের জন্য একটি পদ রয়েছে। গত বছর এ বিষয়ে সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল। তবে আবেদন জমা না পড়ায় এখনো অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আগামী জানুয়ারিতে অধ্যাপক নিয়োগের কথা রয়েছে। আশা করি, খুব দ্রুত এ বিষয়ে ফল আসবে এবং সমস্যার সমাধান হবে।’
পড়াশোনার মান উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য অধ্যাপকের গুরুত্ব অপরিসীম বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার। তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের কাছ থেকে অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আরও বেশি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।’ ইউজিসির অনুমোদন না থাকায় কয়েকটি বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি। উপ-উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে যেসব বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগের অনুমতি নেই, সেসব বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে নতুন করে ইউজিসির কাছে পাঠানো অর্গানোগ্রামে এসব বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউজিসি থেকে অনুমতি পাওয়া গেলে এসব বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হবে।’
আপনার মতামত লিখুন :