
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে হাজার হাজার অস্থায়ী হকারের উচ্চ ক্ষমতার এলইডি বাতি, টিউবলাইট ও ফ্যান। তবে এই কৃত্রিম আলোর ঝলকানির পেছনে রয়েছে সরকারি সম্পদ চুরির এক সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। কোনো বৈধ মিটার বা বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন ছাড়াই পুরো শহরজুড়ে কয়েক লাখ অবৈধ বাতি জ্বলছে। সাধারণ নাগরিক যখন বিদ্যুতের বাড়তি বিলের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন ফুটপাতের এই চোরাই সংযোগ থেকে অর্জিত কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের পকেটে।
ডিপিডিসি ও ডেসকোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং টহল পুলিশের একাংশের সহযোগিতায় এই বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব চলছে। গুলিস্তান, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১০ ও নিউ মার্কেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিকেলের পর সক্রিয় হয়ে ওঠেন চিহ্নিত লাইনম্যানরা। তারা সরকারি বিদ্যুতের খুঁটি, ফিডার বক্স, ট্রান্সফরমার ও রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে সরাসরি হুকিং করে মাকড়সার জালের মতো বিপজ্জনক তারের সংযোগ তৈরি করেন।
সিন্ডিকেটটি প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কালামের লোক এসে বাতিপ্রতি ১০০ টাকা নিয়ে যায়। শুধুমাত্র গুলিস্তান ও পল্টন এলাকাতেই অন্তত আট হাজার অবৈধ দোকান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল তোলা হয়, যা বছরে প্রায় ৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এই অর্থের পুরোটা লাইনম্যান, ডিপিডিসির দুর্নীতিবাজ পরিদর্শন কর্মী এবং অসাধু পুলিশ সদস্যদের পকেটে যায়। অথচ সরকার বা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এখান থেকে এক টাকাও রাজস্ব পায় না, উল্টো সিস্টেম লসের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ বৈধ গ্রাহকদের ওপর।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সিন্ডিকেট পরিচালনাকারীদের নাম। গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় কালাম ওরফে কারেন্ট কালাম ও ইসমাইল, ফার্মগেটে রানা কসাই ও বিল্লাল, নিউ মার্কেটে ফেনী সাইদুল ও রফিক, মিরপুর-১০ এ আবুল কালাম এবং কারওয়ান বাজারে জসিম উদ্দিন সক্রিয় রয়েছেন। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, টাকা না দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং ফুটপাতে দোকান বসাতে বাধা দেওয়া হয়।
ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও অসাধু চক্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় হুকিং করে লাইন চালু করে। রাতে অভিযানের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিপিডিসির আরেক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, নিচের তলার কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া এই নেটওয়ার্ক টিকে থাকা অসম্ভব। পিডিবির কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানান, এই চুরি সিস্টেম লস বাড়িয়ে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) জানিয়েছেন, পুলিশ বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে এবং অবৈধ সংযোগের সাথে জড়িতদের তালিকা করে চিরুনি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সুশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন সতর্ক করেছেন যে, এই অপরিকল্পিত ও অবৈধ সংযোগ যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তারা স্মার্ট মিটারিং ও অসাধু কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ওপর জোর দিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :