রাঙামাটির সাজেক থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি ফেরার পথে অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েছিলেন পর্যটকেরা। এ সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটলে পর্যটকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের পর্যটক মোহাম্মদ নাঈম এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সারা রাস্তা আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম, মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। পুরো সময়টা কীভাবে কেটেছে, তা ভাবলে এখনো ভয় লাগে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠনের ডাকে সাজেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়েছে। অবরোধের প্রথম দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে খাগড়াছড়ি শহরে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে ফেরার পথে বাঘাইছড়ির উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচলে বাধা দেয় এবং এ সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছে। তবে ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মোহাম্মদ নাঈম জানান, নিজের দুই শিশুসন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১৯ জন সদস্য নিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। সাজেকে অবস্থানকালে অবরোধের খবর শুনে তারা কীভাবে খাগড়াছড়ি শহরে ফিরবেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিলেন। পরে তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় পৌঁছে দেওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু পথেই অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন তারা। নাঈম বলেন, ‘সাজেক থেকে ফেরার পথে সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে ছিলাম। কী হবে তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ছিল। অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়ার পর ভয় আরও বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে জানলে জীবনেও এখানে আসতাম না।’
নাঈমের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়িতে ফেরা আরেক পর্যটক মাইন উদ্দিন। খাগড়াছড়ি শহরের একটি হোটেলে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘গাড়ি আটকে দেওয়ার পর আমরা গাড়ির ভেতর বসে ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। দেখি, মানুষ দৌড়ে এদিক-সেদিক পালিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমাদের সঙ্গে থাকা নারীরা কান্না শুরু করে দেন।’ মাইন উদ্দিন আরও জানান, ‘দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে দীঘিনালায় পৌঁছেছি। আমরা সেখানে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের দলের আরেকটি গাড়ির জন্য। তাঁরা ফেরার পর কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এর আগে পুরো সময়টাই আতঙ্কে কেটেছে। কী ঘটতে যাচ্ছে, বুঝতে পারছিলাম না।’
একই হোটেলে ঢাকার উত্তরা থেকে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক রাশেদ আহম্মেদের সঙ্গেও কথা হয়। তাঁর শুক্রবার সকালে ফেরার কথা ছিল, রুমও সেভাবে বুকিং দেওয়া হয়েছিল। তবে বুধবার সন্ধ্যায় কংলাক পাহাড় থেকে নামার সময় কয়েকজন পর্যটকের কাছে তিনি সড়ক অবরোধের খবর শোনেন। খবর শুনে তাড়াহুড়া করে কটেজে ফিরে আসেন এবং পরদিন সকাল আটটার মধ্যে রুম ছেড়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় তাদের খাগড়াছড়ি নিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানানো হয়। ফেরার পথের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রাশেদ বলেন, ‘সকাল আটটায় গাড়িতে উঠে বসে থাকি। নয়টার দিকে কিছুটা পথ আসার পর অবরোধকারীরা উজো বাজার নামক স্থানে আমাদের গাড়ি আটকে দেন। প্রায় আধা ঘণ্টা আটকে ছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘অবরোধকারীদের বাধায় আটকে পড়ে গাড়িতে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের সঙ্গে থাকা শিশুরা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এর মধ্যে আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে একটি ঢিলও ছোড়া হয়েছিল। যদিও কারও গায়ে লাগেনি। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে কোনোমতে সেখান থেকে খাগড়াছড়ি চলে এসেছি। এখনো সেই কথা মনে হলে ভয় লাগে। শহরের আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেতেও কেমন জানি ভয় লাগছে।’
অবরোধের কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে সবাইকে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক ছাড়তে শুরু করেন পর্যটকেরা। বর্তমানে সাজেক থমথমে অবস্থায় রয়েছে, যানবাহন চলাচল করছে না এবং দোকানপাট বন্ধ আছে। অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া অন্যতম। তবে জেএসএসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই।
এদিকে, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ নামের একটি সংগঠন আগামীকাল শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধা বেলা অবরোধ পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :