
র্যাব-১ কার্যালয়ের গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে।
শনিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সঙ্গে নিয়ে র্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এতদিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চললেও বিচারকদের সরেজমিনে ঘটনাস্থল দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের এই পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে লিপিবদ্ধ থাকবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত হবে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের ভেতরে মোট ২২টি ছোট-বড় কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আমিনুল ইসলাম জানান, কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো এবং অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। অনেককে পরে আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে এখনো নিখোঁজ। এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি, যাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীও রয়েছেন।
তদন্তকারীরা ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল সেটিও শনাক্ত করেছেন। চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, ট্রাইব্যুনাল এখন ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত গোপন আটককেন্দ্র ‘জেআইসি’ পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এসব ঘটনা কেবল আইন লঙ্ঘন নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার আলামত পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহের ভিত্তিতে দেয়াল অপসারণ করলে গোপন কক্ষগুলো বেরিয়ে আসে। নিচতলার একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আমিনুল ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার চেষ্টা করেছেন বা প্রমাণ নষ্টে জড়িত ছিলেন, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিরপেক্ষ বিচার পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পাশাপাশি সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্ত করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :