
মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত ও দণ্ডনীয় করা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের অধিকার প্রবর্তনের লক্ষ্যে তিনটি বিল আজ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন। বিলগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন তারা। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিলগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।
‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-এ ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে একটি কার্যকর ও স্বাধীন কমিশন গঠনের জন্য নতুন আইনি কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন, যাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকবেন। জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলে কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করার পাশাপাশি অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাব রয়েছে। তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক হুমকি থেকে সুরক্ষা এবং আরও ক্ষতি প্রতিরোধে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ‘ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম’ (এনপিএম) ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রবর্তন) বিল পাস করে ২০০৯ সালের কমিশন আইন পুনর্বহাল এবং অন্তর্বর্তী সরকার জারি করা কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছিল।
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগী মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলে গুমকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত আইনে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আদালতকে তল্লাশি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা, অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য তার সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ ব্যক্তির সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। বিলে গুমের ঘটনা নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থার প্রস্তাব থাকলেও কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়নি; তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই থাকবে। তদন্ত ও বিচার—উভয় কার্যক্রম সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এ ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে আজীবন ভোগদখলের অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্ত-সম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন করে আজীবন ভোগের অধিকার সংরক্ষণকারী দানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সব ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে। সরকার জানিয়েছে, নতুন এ ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্যান্য পদ্ধতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও এসব বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :