
বৃটেনের স্কুলগুলোতে যৌন অপরাধের ঘটনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র বা ছাত্রীদের যৌন শিকারে পরিণত করার মতো গুরুতর অভিযোগে গত এক বছরে রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। টিচিং রেগুলেশন এজেন্সির (টিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক বছরে ২১৪ জন শিক্ষককে পেশা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা। দ্য সান অন সানডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হিসাবে স্কুল খোলা থাকা প্রায় প্রতিটি দিনের জন্য একজনেরও বেশি শিক্ষককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৮ জন শিক্ষক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন।
নিষিদ্ধ হওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ রয়েছে। কেউ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেছেন, কেউ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত সাইটে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করেছেন, আবার কেউ শ্রেণিকক্ষে মাতাল অবস্থায় উপস্থিত হয়েছেন। টিআরএ-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন অসদাচরণ এবং পেশাগত সীমারেখা লঙ্ঘনই শিক্ষক নিষিদ্ধ হওয়ার প্রধান কারণ। ২০২১-২২ সময়ে ১০৮ জন, ২০২২-২৩ সময়ে ১৩৭ জন, ২০২৩-২৪ সময়ে ১৫৭ জন, ২০২৪-২৫ সময়ে ১৯১ জন এবং ২০২৫-২৬ সময়ে ২১৪ জন শিক্ষককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে দুই বছরে টিআরএ ৩ হাজার ২৭৬টি অসদাচরণের অভিযোগ পেয়েছে এবং ১ হাজার ৬৩১টি তদন্ত শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে, যা পেশাগত সীমারেখা লঙ্ঘনের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাবেক শিক্ষক নাতাশা কোস্তালাস জানান, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের নামে অস্বাভাবিক মাত্রা তৈরি করছেন। ইংরেজি শিক্ষক জেন ডেনিং এর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করে বলেন, এটি অনৈতিক ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সহজ করলেও সীমারেখা লঙ্ঘনের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত এক বছরে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক গভীর রাতে ডিজিটাল বার্তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ রাখছিলেন।
প্রতিবেদনে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। জর্জিয়া লো (২৮) প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সঙ্গে ইমেইলে অন্তর্বাস পরা ছবি আদান-প্রদান করেন। থমাস মনরো (২৯) তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগত যৌন পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আলোচনা করতেন। রেবেকা জয়নেস (৩২) ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে কারাদণ্ড পেয়েছেন। লিয়ান বার্কলে (৪৩) ছাত্রীকে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাতেন, লিন্ডি করস্টন (৬১) প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইটে নগ্ন ভিডিও প্রকাশের দায়ে এবং লুইস ডেভিস (৩৯) স্কুলের শ্রেণিকক্ষে যৌন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় নিষিদ্ধ হয়েছেন। মাদক ও অ্যালকোহল-সংক্রান্ত অপরাধেও অনেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন, যেমন রোয়ান বার্নিকোট (২৯) কোকেন সেবন এবং লেসলি বয়শার (৬১) মাতাল অবস্থায় স্কুলে উপস্থিত হওয়ার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন।
স্কুল পরিদর্শক ক্লেয়ার প্ল্যাট এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে স্কুলের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষক সংকট এবং নতুন শিক্ষকদের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্কুল-বেসড টিচার ট্রেইনার্সের প্রধান নির্বাহী এমা হলিস। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবিতে প্রচার চালানো রিয়া কাল্লি বলেন, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে করা ঠিক নয়, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষা নীতিমালা পর্যালোচনা করা জরুরি। টিআরএ জানিয়েছে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকতা পেশার প্রতি জনআস্থা বজায় রাখা।
আপনার মতামত লিখুন :