দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেন দলের চেয়ারম্যান ও নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সরকার গঠনের প্রায় আট মাস পার হতে চললেও দল হিসেবে বিএনপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাংগঠনিক উপস্থিতি মাঠে কতটা দৃশ্যমান, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার বড় দায়িত্ব কাঁধে আসার পর সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং মন্ত্রী-এমপিদের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের দেখা মিললেও দলীয় পরিচয়ে নিয়মিত জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিকভাবে দলটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনৈতিক চর্চা থেকে হঠাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় আসায় দল ও সরকারের ভূমিকা একাকার হয়ে গেছে। অথচ গত ৯ মে দলের এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, দল ও সরকারকে সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু গত ছয় মাসেও সেই ঘোষণার কার্যকর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। এমনকি জ্বালানি সংকট, হাম ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতেও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, দল ও সরকার আলাদা রাখার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক কাজ একরকম ঝিমিয়ে পড়েছে। সারা দেশের ৮২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে ৭৪টিই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। অধিকাংশ উপজেলা ও থানায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি তো নেই-ই, আর যেগুলো রয়েছে সেগুলোর সিংহভাগই আবার স্থানীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তৃণমূল পর্যায়ে নতুন করে কমিটি পুনর্গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনে তার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না, যা দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা লঙ্ঘনেরও ইঙ্গিত দেয়।
সরকার গঠনের পর থেকে নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পরিবেশেও এসেছে বড় পরিবর্তন। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে যে কার্যালয়টি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মিছিল, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও নেতাকর্মীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে সরগরম থাকত, সেটি এখন অনেকটাই শান্ত ও ফাঁকা দেখা যায়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখন মন্ত্রিসভা, সংসদ ও সরকারের নীতি নির্ধারণী দায়িত্বে যুক্ত। একইভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও মন্ত্রী-এমপিদের প্রটোকল রক্ষা ও সরকারি কাজে বেশি সময় দিচ্ছেন। এমনকি মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা স্থায়ীভাবে ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের আশপাশে অবস্থান করছেন, যার ফলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ স্থানীয় রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা কর্মীদের মূল্যায়ন না করে নতুন ও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী ও এমপিদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নিজস্ব বলয় ও ব্যক্তিস্বার্থের অনুসারী গোষ্ঠী। দলীয় কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব বাড়ছে এবং পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। এতে করে যে সাংগঠনিক প্রাণচাঞ্চল্য থাকার কথা ছিল, তার অভাব দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া থেকে বিরত থাকতে হাইকমান্ডের কঠোর সতর্কবার্তার কারণেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
মাঠের রাজনীতিতে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ শৈথিল্য ও দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়েন বা উত্তেজনা তৈরি হলেও দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে বিএনপি সে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনার সঙ্গে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং মাঠের রাজনীতিতে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, বিএনপি যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি জানান, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠনকে সুসংহত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সম্প্রতি দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সর্বস্তরের কমিটি পুনর্গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, মন্ত্রী ও এমপিরা দলের মূল নেতা হওয়ায় সরকার ও দলের কার্যক্রম পুরোপুরি আলাদা করা বেশ কঠিন। তবুও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই এই দুটিকে পৃথক রাখার আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের অপর এক জ্যেষ্ঠ নেতা উল্লেখ করেন, একই ব্যক্তির ওপর দ্বৈত দায়িত্ব থাকায় সমন্বয় করা জটিল হয়ে পড়ে, তাই ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতির বাস্তবায়নই একমাত্র কার্যকর সমাধান হতে পারে।
জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাদের সিদ্দিকী জানান, ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয় পেয়ে নেতাকর্মীদের কাজের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। তবে সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা, সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভেতরে আলোচনা করা ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করা যাবে না। প্রাক্তন ছাত্রদল নেতা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত বলেন, নির্বাচনের পর নেতারা নিজেদের এলাকার সংগঠন গোছাতে ব্যস্ত আছেন। ইতোমধ্যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করা ২৫ থেকে ৩০ জনের বেশি সাবেক ছাত্রদল নেতাকে মন্ত্রী ও এমপি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং বাকি ত্যাগীদেরও ধাপে ধাপে মূল্যায়ন করা হবে।
সংগঠন স্থবির হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি মেনে না নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিছুটা স্তিমিত হয়েছে মাত্র। অচিরেই নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে নতুন পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে। একই সুর ব্যক্ত করে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, সরকার গঠনের পর প্রথম কয়েক মাস জনগণের প্রাথমিক চাহিদা মেটানোই ছিল প্রথম অগ্রাধিকার। তবে তার পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজও চলছে এবং খুব শিগগিরই সারা দেশে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা আরও বাড়ানো হবে।
আপনার মতামত লিখুন :