পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী হিসেবে বিবেচিত জাহাজভাঙা শিল্পকে 'লাল' শ্রেণি থেকে 'কমলা' শ্রেণিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করার আবশ্যকতা উঠে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা পরিবেশ ও শ্রমিকদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ড উভয়ই 'লাল' শ্রেণির শিল্প হিসেবে বিবেচিত। এই বিধিমালা অনুযায়ী, 'লাল' শ্রেণির কারখানা বা স্থাপনা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বর্তমানে, ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্যও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বাধ্যতামূলক।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, 'লাল' শ্রেণির অধীনে একটি ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য প্রথমে বিস্তারিত কার্যপরিধি (টিওআর) অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হয়। এরপর ইআইএ কার্যক্রম শুরু হয়, যার অংশ হিসেবে জনমত যাচাই ও প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সদর দপ্তরে যাচাই-বাছাই শেষে অবস্থানগত ছাড়পত্র এবং পরবর্তীতে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়, যা পেতে প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে।
তবে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিল্পটি 'কমলা' শ্রেণিতে এলে এই বাধ্যবাধকতা থাকবে না। 'কমলা' শ্রেণির শিল্পের জন্য প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দিলেই হবে। বিভাগীয় কার্যালয় ইআইএ করার প্রয়োজন মনে করলে সুপারিশ করতে পারবে, তবে তা মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ইয়ার্ড স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদনও বিভাগীয় কার্যালয় থেকেই দেওয়া হবে, সদর দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনের ফলে একটি ইয়ার্ডের দূষণের মাত্রা ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব জানার সুযোগ থাকবে না এবং শিল্পের তদারকব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, 'লাল' শ্রেণিতে থাকার কারণে ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন পেতে ৯০ দিনের মতো সময় লাগে, যা তাঁদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রথম আলোকে বলেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা একেকটি ইয়ার্ডে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'পরিবেশ ও শিল্প দুটোই বাঁচাতে হবে।' শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, এটি একটি সম্ভাবনাময় শিল্প এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে। গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ বড় একটি অংশ ভাঙার কাজ পাবে।
তবে পরিবেশবাদীরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলছেন, জাহাজভাঙা শিল্প উচ্চ ঝুঁকি ও দূষণকারী শিল্প। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক শিল্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে জাহাজ ভাঙা হয়, সেখানকার সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, মাটি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালা শিথিল করা জাহাজভাঙা দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত আগস্টেও গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। রিজওয়ানা হাসান প্রশ্ন তোলেন, সেন্ট মার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবেশবাদীদের ডাকা হলেও জাহাজভাঙা নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশকর্মীকে কেন ডাকা হলো না।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি এই শিল্পকে 'লাল' থেকে 'কমলা' শ্রেণিতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আগস্ট মাসে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি পর্যালোচনার জন্য গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব এবং আইন ও সংসদবিষয়ক সচিব এই কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে, কমিটিতে কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, বর্তমানে প্রতিবছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে ১৫০ থেকে ২০০ জাহাজ ভাঙা হয়। একটি জাহাজ ভাঙতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে এবং এসব ইয়ার্ডে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বাসেল কনভেনশন অনুযায়ী বর্জ্যের দায়দায়িত্ব উন্নত বিশ্বের ওপর বর্তানোর কথা বলেন এবং বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙতে ড্রাইডক (বিশেষায়িত স্থাপনা) ছাড়া বিকল্প নেই বলে মত দেন। তাঁরা আরও বলেন, উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পকে সবুজ করা যাবে না এবং এই শিল্পকে নিরাপদ করতে হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে। জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের দাবিও উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :