Facebook Twitter Instagram YouTube

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় বিপর্যয়


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৪, ২০২৬, ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ /
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় বিপর্যয়

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা ও দাম হ্রাসের যে গড় হার, বাংলাদেশের পতন তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো কোনো না কোনো কৌশলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখলেও বাংলাদেশ একমাত্র বড় সরবরাহকারী দেশ, যেখানে একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং দর (প্রাইস) কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে রপ্তানির এই চিত্র পাওয়া গেছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউ’র সার্বিক পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৯৬ শতাংশ। এ সময়ে ইইউ’র আমদানি ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে। মূলত ইউরোপের বাজারে পোশাকের সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়া (ভলিউম হ্রাস ৬.৪৬%) এবং পণ্যের গড় দাম কমে যাওয়া (ইউনিট প্রাইস হ্রাস ৩.৭৪%)—এই দুই কারণে বাজারে সামগ্রিক মন্দা দেখা দিয়েছে।

তবে বৈশ্বিক এই মন্দার ধাক্কা বাংলাদেশের গায়ে লেগেছে সবচেয়ে তীব্রভাবে। এই পাঁচ মাসে ইইউ’র বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৮.৮৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ (ভলিউম) কমেছে ১০.৪৬ শতাংশ এবং পোশাকের গড় দাম কমেছে ৯.৪১ শতাংশ। একক মাস হিসেবে মে মাসেও এই নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত ছিল। মে মাসে মূল্য কমেছে ১৭.১২ শতাংশ এবং ভলিউম কমেছে ১৩.৫৫ শতাংশ। এপ্রিলের পর মে মাসেও এই দ্বিমুখী পতন অব্যাহত থাকায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা বেশ উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশ যখন একই সঙ্গে দাম ও পণ্যের পরিমাণ—দুই ফ্রন্টেই বাজার হারাচ্ছে, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে বাজার সামাল দিচ্ছে। ভিয়েতনাম কম ভলিউমেও বেশি দাম আদায় করতে পারছে, আর চীন কম দামে বেশি ভলিউম সরবরাহ করে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে।

অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজারচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কম হ্রাস পাওয়া দেশ চীন (-৪.২০%)। ইইউ’র বাজারে একমাত্র চীনই পোশাক সরবরাহের পরিমাণ বা ভলিউম ১.৯৬ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। মূলত পোশাকের দাম ৬.০৫ শতাংশ কমিয়ে তারা বাজার ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে বাজারে সবচেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে ভিয়েতনাম। তাদের রপ্তানি কমেছে মাত্র ১.৫১ শতাংশ। ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির ভলিউম ১২.২৭ শতাংশ কমলেও প্রিমিয়াম পণ্য সরবরাহ করায় পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১২.২৬ শতাংশ। ফলে তারা মূল্যের দিক থেকে বড় ক্ষতি এড়াতে পেরেছে।

পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানি আয় ১৭.০১ শতাংশ কমলেও তাদের ভলিউম বেড়েছে ৩ শতাংশ। মূলত পণ্যের নজিরবিহীন দরপতনের (-১৯.৪৩%) কারণেই পাকিস্তানের সামগ্রিক আয় কমেছে। তুরস্ক ও কম্বোডিয়া—এই দুই দেশের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমলেও (যথাক্রমে -১৭.১৭% ও -১৫.১৩%) পোশাকের গড় দাম বেড়েছে। ভারতের রপ্তানি কমেছে ১৩.৩৩ শতাংশ। দেশটির চিত্রও বাংলাদেশের মতো দ্বিমুখী দুর্বলতার হলেও পতনের তীব্রতা বাংলাদেশের চেয়ে কম। এছাড়া পোশাক সরবরাহের পরিমাণে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে ইন্দোনেশিয়ায় (-২৩.৭৬%)।

রপ্তানিকারকরা জানান, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের মূল চালিকাশক্তি ছিল সস্তা দরে পণ্য সরবরাহ করা। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান ও চীনের আগ্রাসী মূল্যছাড়ের কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধাজনক অবস্থান হারাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ তার দরকষাকষির সক্ষমতা হারাচ্ছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গত কয়েক মাস ধরে আমাদের উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রেতারা দাম দিচ্ছেন না। উল্টো প্রতিযোগী দেশগুলো দাম কমিয়ে আমাদের অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত পণ্য বহুমুখীকরণ এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের (ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্ট) দিকে না যাই, তবে ইউরোপের এই বাজারে আমাদের হিস্যা আরও সংকুচিত হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin