Facebook Twitter Instagram YouTube

আইসিটি শিক্ষক ছাড়াই ১৩ বছর, ব্যবহারিক ক্লাসেও চরম সংকট


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৪, ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ /
আইসিটি শিক্ষক ছাড়াই ১৩ বছর, ব্যবহারিক ক্লাসেও চরম সংকট

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ১৩ বছর আগে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে এটি চালুর সময় থেকেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের সমন্বয় ছিল না। ফলে সরকারি কলেজগুলোতে এখনো নিজস্ব আইসিটি শিক্ষকের অভাব প্রকট। এমনকি দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটিতেও এই বিষয়ের আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে সরকারি কলেজগুলোতে পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা বা অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও প্রোগ্রামার, অতিথি বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষকরাই ঘুরেফিরে বিষয়টি পড়ান।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সরকারি কলেজগুলোতে একটি করে মোট ২৫৫টি আইসিটি প্রভাষকের ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়। পরে আরও ১৮টি ক্যাডার পদ সৃষ্টি হয়। এরপর ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক সরকারি কলেজে যোগ দেন। বর্তমানে তাঁদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৩২ জন। প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয়ে অন্তত একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষকের পদ থাকার কথা থাকলেও আইসিটির ক্ষেত্রে অধিকাংশ কলেজে সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সর্বশেষ ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে মোট ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে সরকারি কর্ম কমিশন সুপারিশ করেছে, তবে তাঁদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি।

বর্তমানে দেশে সরকারি কলেজ ৭০৮টি, যার মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। ২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারি হওয়া পুরোনো কলেজ রয়েছে ৩৪৫টি, যার মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি। তবে ১৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষকের পদ রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া ৩৬৩টি কলেজের মধ্যে ১০২টিতে আইসিটি বিষয়ের পদ নেই। ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া কলেজগুলোর আইসিটি পদ নন-ক্যাডার হওয়ায় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা এসব পদে যোগ দিতে পারেন না।

মাধ্যমিক পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি, যার মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি। মাউশি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এর মধ্যে এক শিফটে পরিচালিত ৫৩২টি বিদ্যালয়ে একটি করে এবং দুই শিফটে পরিচালিত ১৭০টি বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষক সংকটের কারণে ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী থাকলেও সেখানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন এবং বেসরকারি উৎস থেকে বেতন পাওয়া দুজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার পাঠদানে যুক্ত আছেন। নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সরকারিভাবে আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন। একই চিত্র নেত্রকোনা সরকারি কলেজে, যেখানে ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র একজন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে আইসিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য মাউশি থেকে চাহিদা ও পদের হিসাব অনুযায়ী প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠিয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এই সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি কলেজে আইসিটি বিষয়ে পদোন্নতির পথও সংকুচিত। ৫১টি সরকারি কলেজে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত আইসিটি বিষয়ে ২৯১টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ফলে ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলেও উচ্চতর পদ না থাকায় পদোন্নতি পাচ্ছেন না। সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আইসিটি প্রভাষকের ২৫টি পদের বিপরীতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জন আবেদন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির নানা পর্যায়ে দ্রুত উন্নতি ঘটছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে আইসিটি বিষয়সংশ্লিষ্ট শিক্ষক না থাকলে এসব পরিবর্তন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo