
দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে ইংরেজি ও গণিত পড়ানো শিক্ষকদের বড় একটি অংশই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নন। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, গণিত পড়ানো শিক্ষকদের ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ইংরেজি শিক্ষকদের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি নেই।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে। এই ফল পর্যালোচনায় ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকট এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতিই এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ।
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে ৬৪ হাজার ১৪৭ জন গণিত শিক্ষক রয়েছেন। এদের মধ্যে মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ শিক্ষকের গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক অন্য বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে গণিত পড়াচ্ছেন। ইংরেজির চিত্রও প্রায় একই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত ৬০ হাজার ৮৫৭ জন ইংরেজি শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৯ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। বাকি ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষক অন্য বিষয়ে ডিগ্রিধারী।
রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রেণিকক্ষে গণিতের পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব রয়েছে। অনেক শিক্ষক সূত্র ও নিয়ম মুখস্থ করানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, যার ফলে প্রশ্নে সামান্য পরিবর্তন এলেই শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে এবং ভুল করে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের কারণে তারা বাধ্য হয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে ইংরেজি বা গণিত পড়াচ্ছেন, যা শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
এসএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে ইংরেজিতে দুর্বলতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এছাড়া বরিশাল বোর্ডে ৬৯ দশমিক ২৪, সিলেট বোর্ডে ৬৯ দশমিক ১১, যশোরে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭, রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০ এবং ঢাকা বোর্ডে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছে। কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। গণিতেও অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সন্তোষজনক নয়। ময়মনসিংহ ও মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯২, দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ৫, সিলেটে ৭৫ দশমিক ৯৬, রাজশাহীতে ৭৭ দশমিক ১৭ এবং বরিশালে ৭৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর ও চট্টগ্রাম বোর্ডে অবশ্য গণিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আব্দুল হালিম বলেন, বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট দীর্ঘদিনের। সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানেই এই সমস্যা বিদ্যমান। তাই দক্ষ শিক্ষক পেশায় আনা জরুরি। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সংকট প্রকট। শিক্ষক সংকট কাটানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষার বৈষম্য কমাতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, শূন্যপদ যাচাই করে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে এসব পদ পূরণের চেষ্টা চলছে।
আপনার মতামত লিখুন :