
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার ৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো সংযোগ সড়ক নেই বা যেগুলো আছে সেগুলোও কাদা ও জলাবদ্ধতায় মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা। স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিকবার প্রশাসনকে বিষয়টি জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
উপজেলার গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। মূল পাকা সড়ক থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র সরু পথটি বর্ষায় প্রায় ছয় মাস ধরে হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকে। এই পথ দিয়ে গাবনা ও পার্শ্ববর্তী গোধইল গ্রামের অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। এছাড়া স্কুলপাড়ার প্রায় ১৫০ পরিবারের ৫০০ মানুষও এই পথটি ব্যবহার করেন। সামান্য বৃষ্টিতেই নিচু রাস্তাটি তলিয়ে যাওয়ায় অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে চরম আতঙ্কে থাকেন। অনেক সময় তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয়।
নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে যাতায়াত করার কারণে শিক্ষার্থীদের পায়ে চুলকানি ও ঘা দেখা দিচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার ও পঞ্চম শ্রেণির রবিউল ইসলাম জানায়, কাদাপানি মাড়িয়ে যাতায়াত করায় তাদের পায়ে ঘা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পানিতে পড়ে গিয়ে বইখাতা ও পোশাক ভিজিয়ে ফেলে। এসব ভোগান্তির কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা জানান, ১৩২ জন শিক্ষার্থী ও ৬ জন শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেমে এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে। শিক্ষকরাও জামাকাপড় নোংরা হওয়ার ভয়ে অতিরিক্ত পোশাক সঙ্গে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।
কেবল যাতায়াত সমস্যাই নয়, গাবনা বিদ্যালয়ের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে থাকা দুটি পুকুরের পাড় ভেঙে ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানান, গাইড ওয়াল নির্মাণ করা না হলে আগামী বছরই হয়তো ভবনটি পুকুরে ধসে পড়বে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে উপজেলার ছোট কাবলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। মূল সড়ক থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দীর্ঘ মাটির সরু পথটি বর্ষায় কাদা ও পানিতে একাকার হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ ও আলতাফ হোসেন দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
বদলগাছী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল ইসলাম জানান, উপজেলায় মোট ১৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪টিতে বর্ষা মৌসুমে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়েছে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুলকেও এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, বেশ কিছু বিদ্যালয়ের সংযোগ সড়কে সমস্যা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সড়কগুলো সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আবারও স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে।
গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক ও ১৩২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে আসছে। অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। আমরা শিক্ষকরাও এই পথ দিয়ে আসার সময় পোশাক নোংরা হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আলাদা পোশাক সঙ্গে নিয়ে আসি। প্রতি বছরই উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসে আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি।’
আপনার মতামত লিখুন :