
নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে চাপের মুখে মাথা নোয়ানো খুব একটা যায় না। বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করা, সিদ্ধান্তে অনড় থাকা এবং মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে আন্দোলনের মুখে সরিয়ে না দেওয়া তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক ধরন। সেই মোদিকেই এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিতে হলো। 'তেলাপোকা আন্দোলনের' এটি প্রথম বড় জয় এবং মোদির জন্য একটি বিরল পিছু হটার ঘটনা।
আন্দোলনকারীরা আপাতত তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি তরুণদের আস্থাহীনতার যে গভীর সংকট এই আন্দোলন প্রকাশ করেছে, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে তা দূর হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা জাতপাত, ধর্ম, গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল 'ভারতীয় শিক্ষার্থী' হিসেবে একাট্টা হয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুবিচার, অত্যাচারীদের শাস্তি, আত্মঘাতী শিক্ষার্থী পরিবারগুলোকে অর্থসহায়তা ও শিক্ষানীতির সংস্কার।
যন্তর মন্তর এলাকাটি পার্লামেন্ট স্ট্রিট, জনপথ ও অশোক রোডের ঘেরাটোপে আটকে ছিল। সেখানে টগবগে তরুণ-তরুণী, সতর্ক নিরাপত্তারক্ষী ও কৌতূহলী জনতা ভিড় করেছিল। ২০ জুলাইয়ের অশান্ত সংসদ ভবন অভিযানের পর যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন ছিল। এছাড়া ১৮টি মেট্রোস্টেশন ও কনট প্লেস এলাকার সব দোকান সন্ধ্যার মধ্যে বন্ধ করার হুকুমে ক্ষোভ দ্বিগুণ হয়েছিল। তবুও শিক্ষার্থীরা হতোদ্যম ছিলেন না।
আন্দোলনের ভেতরে কিছু সংশয়ও ছিল। ২৬ দিনের অনশন শেষে শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে ফলের রস খাওয়ায় সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা নিয়ে চাপা আলোচনা চলছিল। তবে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে ছাত্রনেতারা স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে তাঁরা সরবেন না। পরদিন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায়। এটি একই সঙ্গে আন্দোলনের শক্তি ও ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের এই ছাত্র জাগরণের কিছু মিল থাকলেও অমিলও গভীর। ভারতে এই আন্দোলন এখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মোদি সরকার এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকদের অবস্থান এবং হিন্দুত্ববাদী সমাজে রামমন্দিরের কোষাকারে দুর্নীতি নিয়ে অসন্তোষের মতো বিষয়গুলো সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি কৃষক আন্দোলনের পর আরও একবার চাপের মুখে পিছু হটলেন। শেখ হাসিনার পতনের ঘটনা তাঁর সামনে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বিসর্জন দিলেও মোদি আপাতত তরি তীরে ভেড়াতে পারেন, কারণ রাষ্ট্রের গোড়া ধরে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ক্ষমতা এই আন্দোলন এখনো অর্জন করতে পারেনি। যন্তর মন্তর শান্ত হবে, কিন্তু রাজনীতি চঞ্চল থাকবে। আপাতত স্বস্তি মিললেও শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
আপনার মতামত লিখুন :