
যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে সদস্যদেশগুলোর পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ’। তবে এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে করিম খানের আইনি দল। ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টার গত জুনে নিজেই দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। আইসিসি জানিয়েছে, এখন থেকে করিম খানের দপ্তরের দায়িত্ব যৌথভাবে পালন করবেন উপপ্রধান কৌঁসুলি নজহাত শামিন খান ও মামে মান্দিয়ায়ে নিয়াং।
করিম খানের আইনি দলের প্রধান তায়াব আলী জানান, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর ‘ওআইওএস’–এর তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি জুডিশিয়াল প্যানেলও সর্বসম্মতভাবে একই সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। তায়াব আলী অভিযোগ করেন, করিম খানকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো ন্যায্য সুযোগই দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ পর্যালোচনা করা স্বাধীন বিচারকদের সিদ্ধান্তকেও এখানে উপেক্ষা করা হয়েছে।
করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা নারী কর্মী, যাঁর পরিচয় শুধু ‘সারাহ’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে, সম্প্রতি সিএনএনকে একটি সাক্ষাৎকারে জানান, করিম খানের আচরণ ধীরে ধীরে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল। তিনি দাবি করেন, একবার তিনি যখন ঘুমের ভান করে শুয়েছিলেন, তখন করিম খান তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়েছিলেন। তবে করিম খান প্রথম থেকেই এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর আইনজীবীদের মতে, যে প্রক্রিয়ায় এই ভোটাভুটি হয়েছে, তা ছিল পদ্ধতিগতভাবে অন্যায্য এবং কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়।
করিম খান বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করার পর তিনি বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। পরে ওই বছরের শেষ দিকে আইসিসির বিচারকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে সেই পরোয়ানা জারি করেন। এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র তোপের মুখে পড়ে আইসিসি।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জেরে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করিম খানসহ আইসিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। আইনজীবী তায়াব আলী বলেন, একদিকে আদালত যখন তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে, অন্যদিকে করিম খান নিজেই যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন, ঠিক এমন এক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার ভোটের মাধ্যমে তাঁকে অপসারণ করা হলো। অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসার প্রায় দুই বছর পর আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই অপসারণের অনুমোদন দিল।
তায়াব আলী সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব করিম খানের ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপসারণপ্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা উচিত, যা রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে অন্যায্য এবং কোনো স্বাধীন জুডিশিয়াল বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলও এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেন, করিম খানের বিরুদ্ধে এই মামলাটি স্পষ্টতই আইসিসির বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি বৃহত্তর আক্রমণের অংশ।
করিম খানকে অপসারণের মধ্য দিয়ে নতুন আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও এ বিষয়ে ভোট আগামী বছরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না, কারণ ওই পরোয়ানা প্রত্যাহারের ক্ষমতা কেবল আইসিসির বিচারকদেরই রয়েছে। তা সত্ত্বেও, এই খবর প্রকাশের পর আইসিসির তদন্তের সমালোচনা করে নতুন করে সরব হয়েছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।
আপনার মতামত লিখুন :