
পৃথিবীর ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের নাম ইসলাম। যখন অধিকাংশ সমাজ নারীকে সম্পত্তির মালিক তো দূরের কথা, বরং সম্পত্তির অংশ হিসেবে গণ্য করত, ঠিক তখনই ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর স্বতন্ত্র ও নির্ধারিত অধিকার নিশ্চিত করেছে। এটি কোনো মানুষের তৈরি আইন নয়, বরং খোদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। জাহেলি যুগে আরব্য সমাজে নারী, শিশু ও দুর্বলদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না; এমনকি মৃত স্বামীর সম্পদের অংশ হিসেবে স্ত্রীকে গণ্য করা হতো। মৃত ব্যক্তির ছেলে চাইলে সৎমাকেও নিজের অধিকারে নিয়ে নিতে পারত, যা ছিল নারীর প্রতি চরম অবমাননা (তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/১৭৯, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)।
ইসলাম এই প্রথা ভেঙে সুরা নিসার ৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছে যে, পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অংশ রয়েছে, তা কম হোক বা বেশি। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এই আয়াত ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘোষণা, যা নারীকে প্রথমবারের মতো উত্তরাধিকারের স্বতন্ত্র অধিকার প্রদান করে। এটি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার, যা বাতিল বা সংকুচিত করার বৈধতা কারও নেই।
ইসলামে উত্তরাধিকার ব্যবস্থা মানুষের ইচ্ছানির্ভর নয়। কোরআনের সুরা নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনের অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়, দেনমোহর প্রদান এবং বহু আর্থিক দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত। পক্ষান্তরে, নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যয়ভার তার ওপর বাধ্যতামূলক নয়। এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতেই উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কন্যা, মা, স্ত্রী ও বোনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন কন্যা থাকলে তিনি অর্ধেক সম্পদের অধিকারী হন, আর দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পান। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা এক-ষষ্ঠাংশ পান, আর সন্তান না থাকলে এবং ভাই-বোন না থাকলে মা এক-তৃতীয়াংশের অধিকারী হন। স্ত্রীর ক্ষেত্রে সন্তান না থাকলে এক-চতুর্থাংশ এবং সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ নির্ধারিত। মৃত ব্যক্তির সন্তান ও পিতা না থাকলে বোন অর্ধেক সম্পদের অধিকারী হন।
সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, ইসলামে নারী সব সময় পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। বাস্তবে এটি সঠিক নয়। যেখানে ছেলে ও মেয়ে একই সঙ্গে উত্তরাধিকারী হয়, সেখানে একজন ছেলের অংশ দুজন মেয়ের সমান করা হয়েছে, যা পুরুষের আর্থিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার মা ও বাবার ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে উভয়ই সমানভাবে এক-ষষ্ঠাংশ করে পান। তাই নারীর অংশ সব ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে কম—এই বক্তব্য কোরআনের সামগ্রিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উত্তরাধিকার বণ্টনে কারচুপি করা, বোন বা কন্যাকে কৌশলে বঞ্চিত করা, জোরপূর্বক লিখিত ছাড়পত্র নেওয়া কিংবা প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা ইসলামে মহাপাপ। সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিনের বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫৩)। সুরা নিসার ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারের বিধানকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা বলা হয়েছে এবং তা লঙ্ঘনকারীকে জাহান্নামের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বহু নারী সামাজিক চাপ, লোকলজ্জা, ভাইদের প্রভাব কিংবা অজ্ঞতার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক পরিবারে উত্তরাধিকার বণ্টন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যা মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি করে। নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং ফারায়েজ বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নারীদেরও নিজেদের শরয়ি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং তা সৌহার্দ্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে দাবি করতে হবে। আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার আদায় করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য, যার মধ্যেই ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :