
আধুনিক সভ্যতার এই যুগে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, হতাশা ও দুশ্চিন্তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে শারীরিক রোগের চেয়ে মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব কোনো অংশে কম নয়। অথচ মানুষ শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে যতটা সচেতন, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই উদাসীন। এই পরিস্থিতিতে ইসলাম মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থতার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ইসলামের বেশ কিছু বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামি জীবনদর্শনে মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা দূর করার প্রধান মহৌষধ হলো আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর ওপর ভরসা করা। মানুষ যখন পার্থিব মোহে ডুবে স্রষ্টাকে ভুলে যায়, তখনই তার মনে হতাশার জন্ম নেয়। এ প্রসঙ্গে সুরা আর-রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে মানুষ তার মানসিক চাপ থেকে সহজেই মুক্তি পেতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর করতে ইসলাম আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করার শিক্ষা দেয়। সুরা আত-তালাকের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ একজন মুমিন যখন বিশ্বাস করে যে তার জীবনের সব ফয়সালা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং তা-ই তার জন্য সর্বোত্তম, তখন তার মন থেকে হতাশা দূর হয়ে যায়।
মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখের পর্যায়ক্রমিক আবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিপদের সময়ে দ্রুত হতাশ হয়ে পড়লে মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। তাই ইসলাম এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছে। সুরা আল-বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ একই সাথে সুরা আল-ইনশিরাহের ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।’ পাশাপাশি দুশ্চিন্তা ও মানসিক পেরেশানি থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। বুখারি শরিফের ২৮৯৩ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, তিনি দোয়া করতেন— ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের ভার ও মানুষদের প্রভাব থেকে।’
মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দেয় ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও একটি সদকা’ (তিরমিজি: ১৯৫৬)। সুন্দর আচরণ, হাসিমুখে কথা বলা এবং আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখলে মানসিক অবসাদ অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে, ইসলাম মানসিক সমস্যাকে কেবল আধ্যাত্মিক দুর্বলতা বা জিনের আছর বলে উড়িয়ে দেয় না, বরং একে একটি রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চিকিৎসার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার ওষুধ তিনি দেননি’ (আবু দাউদ: ৩৮৫৫)। সুতরাং, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের শিকার হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ওষুধ সেবন করাও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি অনুশাসন মেনে চলার মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক প্রশান্তির পাশাপাশি জাগতিক দুশ্চিন্তা থেকেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ৩৭আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ৩৮
পাশাপাশি আল্লাহ মুমিনদের এই বলে সান্ত্বনা দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ : ৫-৬)
আপনার মতামত লিখুন :