
আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস উপলক্ষে শনিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি নিজে এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স বা গুমের শিকার হওয়ায় এই যন্ত্রণার ভয়াবহতা ভালো করেই বোঝেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আমি চাইব না বাংলাদেশে আর কেউ গুম হোক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গুমের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার এমন একটি আইন সংসদে এনেছে, যেখানে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার সরাসরি আদালতে গিয়ে বিচার চাইতে পারবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই আইনে গুমের ধরন, অপরাধের শাস্তি, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীর অধিকার সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলেও তার উত্তরাধিকারীরা যেন সম্পত্তির অধিকার ও ক্ষতিপূরণ পান, সেটিও আইনে রাখা হয়েছে। গুম কমিশন অধ্যাদেশ পাস না করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শুধু কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি আইনটির বিষয়ে যেকোনো মতামত সংসদীয় কমিটিতে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আইন সংশোধনের সুযোগ থাকবে বলে আশ্বাস দেন।
র্যাব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বাহিনীটি বিলুপ্ত না করে জবাবদিহিমূলক সংস্কারের পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, আধুনিক সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি এলিট ফোর্স দরকার, তবে তাদের স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। গত ছয় মাসে একটি ‘ভঙ্গুর বাহিনী’ পেলেও তাদের মনোবল ও নৈতিকতা পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
নিজের ৬১ দিনের গুমের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই বিভীষিকাময় সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত যদি লিখে রাখা যেত, তবে তা একটি বড় সংকলন হতো। পাঁচ ফুট বাই দশ ফুটের ছোট একটি কক্ষে বন্দি থাকার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, নখের দাগ দিয়ে দেয়ালে দিন গুনতেন তিনি। পরবর্তীতে তাকে ভারতের শিলংয়ে নির্জন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ও হাসপাতালের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান তিনি। গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে হাস্যরসের প্রবণতা চলছে, তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এই অপকালচার ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হতাশ করবে।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। তিনি রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে বাঁচাতে গণতন্ত্র চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন। গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান পরিবারগুলোর তিনটি দাবির কথা তুলে ধরেন—জবাবদিহি, বিচার ও সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ। তিনি নতুন আইনের ১৪, ১৯ ও ২১ ধারা বাতিলের দাবি জানান এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশনের আহ্বান করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন হুমাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, শহীদুল আলম, তানজিম ওয়াহাব, নূর খান লিটন ও নাজমুল আহসান। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।
আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্য, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
আপনার মতামত লিখুন :