
হান কাংয়ের উপন্যাস ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ শুরু হয় ইয়ং-হে নামের এক নারীর একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার ঘটনা দিয়ে। একদিন ভোরে তার স্বামী তাকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, যেখানে ফ্রিজের আলো তার মুখে এসে পড়ছে। ইয়ং-হে জানান, তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছেন—আর এই একটি বাক্য থেকেই উপন্যাসের মূল ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। তবে এই গল্পটি নিছক মাংস খাওয়া বা না-খাওয়ার বিষয় নয়, বরং ইয়ং-হে-র মাংস বর্জনের সিদ্ধান্তটি যেন একটি দরজার মতো, যা খুলে গেলে মানুষের শরীর, পরিবার, ভালোবাসা, পুরুষতন্ত্র এবং সহিংসতার অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচিত হয়।
ইয়ং-হে-র স্বামী তার জীবনকে সাধারণ ও জটিলতাহীন হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন। ইয়ং-হে-কে স্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও তার যুক্তি ছিল সহজ। কিন্তু ইয়ং-হে যখন মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিলেন, তখন স্বামীর কাছে তা বিরক্তিকর, অস্বাভাবিক এবং লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হান কাং এই গল্পের মাধ্যমে একটি আয়না তুলে ধরেন—আমরা কি সত্যিই আমাদের কাছের মানুষদের চিনি, নাকি কেবল তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশিত আচরণটুকু আশা করি? ইয়ং-হে-র নীরবতার মধ্যেই সহিংসতা জন্ম নেয়, যেখানে কেউ কাউকে আঘাত না করলেও, একজন মানুষ অন্যজনকে নিজের মতো থাকার অধিকার দিতে অস্বীকার করে।
ইয়ং-হে-র মাংস না খাওয়ার পেছনে থাকা ভয়ংকর স্বপ্ন, রক্ত, মাংস ও মৃতদেহের উৎস সম্পর্কে লেখক কোনো নিশ্চিত চাবি দেননি। পাঠক যখনই কোনো উত্তরের কাছাকাছি পৌঁছান, গল্পটি নতুন দিকে মোড় নেয়। ইয়ং-হে নিজের শরীরের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও তার বাবা, স্বামী, দুলাভাই এবং চিকিৎসকরা তাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চান। সমাজ তাকে অসুস্থ বা অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করে, কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—একজন মানুষের শরীরের মালিক আসলে কে? সমাজ, পরিবার, স্বামী, চিকিৎসাব্যবস্থা নাকি সেই মানুষটি নিজেই?
উপন্যাসের পরবর্তী অংশে ইয়ং-হে মানুষের পৃথিবী থেকে দূরে সরে গিয়ে গাছ ও ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হন। গাছ হতে চাওয়ার এই অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা আসলে এমন এক পৃথিবীর প্রতীক, যেখানে কাউকে হত্যা করতে হয় না বা অন্যের শরীরের ওপর অধিকার দাবি করতে হয় না। এই অন্ধকার যাত্রায় তার বোন ইন-হে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে পাশে থাকেন। তিনি বোনকে পুরোপুরি না বুঝলেও তার প্রতি ভালোবাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়া বা খাবার নিয়ে আসার মতো কাজগুলো করেন, যা মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
পরিশেষে, ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ আমাদের সমাজ ও স্বাভাবিকতার সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাংস এখানে শরীর, আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার প্রতীক। হান কাং তার শান্ত ও সরল গদ্যে ইয়ং-হে-র মাধ্যমে আমাদের সামনে এমন এক প্রশ্ন রেখে যান, যা উপন্যাস শেষ হওয়ার পরও কুয়াশার মতো আমাদের মধ্যে থেকে যায়—একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা নিজের হতে পারে?
আপনার মতামত লিখুন :