
রিজিক অন্বেষণের প্রয়োজনে মানুষকে বিভিন্ন কাজ ও পেশার সঙ্গে জড়াতে হয়। ইসলাম বেশির ভাগ কাজ ও পেশাকে বৈধতা দিয়েছে, তবে এমন কিছু পেশা ও শিল্পকর্ম রয়েছে, যেগুলো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। মূলত ইসলামি সমাজের আকিদা-বিশ্বাস, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মান-সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা মুলকের ১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে তোমরা আহার করো। আর পুনরুত্থান তো তাঁরই কাছে।'
ইসলামে নিষিদ্ধ পাঁচটি পেশার মধ্যে অন্যতম হলো সুদের কারবার। আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'যারা সুদ খায়, তারা তার মতো (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে তারা বলে ব্যবসা তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।' সুদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো পেশায় নিজেকে জড়ানো যাবে না। সুদের কারবার করা, সুদি লেনদেন করা এবং সুদি কারবারে সাক্ষী হওয়া নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, এরা সবাই সমান অপরাধী (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪১৭৭)।
মদ বা নেশা উদ্রেককারী সব দ্রব্য প্রস্তুতকরণ, বণ্টন ও সেবন ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের সবার প্রতি মহানবী (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। তিনি বলেছেন, মদের ওপর দশভাবে অভিসম্পাত করা হয়েছে—মদ, মদ উৎপাদক, মদ উৎপাদনের নির্দেশদাতা, মদ বিক্রেতা, মদের ক্রেতা, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদের মূল্য ভোগকারী, মদ পানকারী ও মদ পরিবেশনকারী (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫)।
পতিতাবৃত্তির পেশাটি ইসলামে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত ও হারাম। কোনো স্বাধীন নারী কিংবা দাসীর জন্য ব্যভিচারের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনের অনুমতি ইসলাম দেয় না। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের দুজন দাসী মুসাইকা ও উমাইমাকে দিয়ে সে জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি করাত। তারা নবীজি (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে সুরা নুরের ৩৩ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়, যেখানে পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদের লালসায় দাসীদের ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নিকৃষ্ট পেশার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন; প্রয়োজন যতই তীব্র হোক, ব্যভিচার কখনোই বৈধ হতে পারে না।
যৌন আবেদনময় নৃত্য, অশ্লীল গান, নগ্ন অভিনয় এবং এ ধরনের সব অশ্লীল কর্ম ইসলামে হারাম। নিষিদ্ধ সম্পর্কের পথ খুলে দেয় এমন প্রতিটি কথা, কাজ ও পদক্ষেপ ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা সুরা বনি ইসরাইলের ৩২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, 'আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।' আল্লাহ তাআলা শুধু ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং এর ধারে-কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন।
ইসলামে দেহবিশিষ্ট মূর্তি ও প্রতিকৃতি তৈরি করা এবং তা সংরক্ষণ করা হারাম। সহিহ বুখারির ২২২৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে জানায় যে, তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম হস্তশিল্পের মাধ্যমে প্রাণীর ছবি ও প্রতিকৃতি নির্মাণ। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী শোনান যে, যে ব্যক্তি কোনো প্রাণীর ছবি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে শাস্তি দেবেন যতক্ষণ না সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে, যা তার পক্ষে অসম্ভব। তবে একান্তই যদি এ কাজ না ছাড়া যায়, তবে গাছপালা ও প্রাণহীন বস্তুর ছবি বা প্রতিকৃতি তৈরির অনুমতি রয়েছে।
পতিতাবৃত্তি : ইসলামে পতিতাবৃত্তির পেশাটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত, হারাম। কোনো স্বাধীন নারী কিংবা দাসীর জন্য ব্যভিচারের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনের অনুমতি ইসলাম কখনও দেয় না। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ রাষ্ট্রে পতিতাবৃত্তি একটি বৈধ পেশা। এর জন্য তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রেখেছে। এই জঘন্য কাজটিকে তারা অন্য দশটি পেশার মতোই দেখে। জাবের (রা.) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের দুজন দাসী ছিল, একজনের নাম মুসাইকা এবং আরেকজনের নাম উমাইমা। সে তাদের দুজনকে দিয়ে জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি করাত। তাই তারা এ বিষয়ে নবীজি (সা.)-এর কাছে অভিযোগ দায়ের করল। তখন আল্লাহতায়ালা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ‘আর তোমাদের দাসীরা সতিত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদের লালসায় তাদের ব্যভিচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করো না। এই নিষেধাজ্ঞার পরও কেউ তাদের বাধ্য করলে, তাদের (দাসীদের) ওপর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩৩; মুসলিম, হাদিস: ৩০২৯)।
আপনার মতামত লিখুন :