
বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আজ রোববার সকালে ছিল এক অন্য রকম নীরবতা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার মানুষ ভিড় করেছিলেন তাঁদের প্রিয় প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য। গত বৃহস্পতিবারও সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘শুক্রবার ঢাকায় চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছি। সবাই দোয়া করবেন। রোববার সকালে আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে।’ কিন্তু সেই দেখা আর হলো না। সহকর্মীরা ভাবতেও পারেননি, সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে শেষ কথা। আজ তিনি বিদ্যালয়ে ফিরেছেন ঠিকই, তবে লাশবাহী গাড়িতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিনে।
গত শনিবার সকাল ছয়টার দিকে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান রনজিলা পারভিন। ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে হেঁচকা টান দিলে তিনি রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। চোখের চিকিৎসক দেখানোর জন্য তিনি স্বামীর সঙ্গে শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। ভোরে কল্যাণপুরে বাস থেকে নেমে রিকশায় করে ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাওয়ার পথে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এই ছিনতাই ও মৃত্যুর ঘটনায় ‘প্যারা পনির’সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির সুনাম ও খ্যাতির পেছনে জড়িয়ে রয়েছে রনজিলা পারভিনের দীর্ঘদিনের শ্রম ও মমতা। তাঁর কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে এই বিদ্যালয়কে ঘিরে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ জন শিক্ষক ও ৮৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেহনাজ আফরিন বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিদ্যালয়টি এলাকায় যে সুনাম অর্জন করেছে, তার পুরো কৃতিত্বই রনজিলা ম্যাডামের।
গত বৃহস্পতিবার ছুটির পরের সময়টুকু এখন বারবার মনে পড়ছে সহকর্মীদের। মেহনাজ আফরিন জানান, ছুটির পর প্রধান শিক্ষক বিদায় নেওয়ার সময় সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেছিলেন, রোববার সকালে আবার দেখা হবে। আরেক সহকারী শিক্ষক রিজনোবা আকতারের কাছেও বৃহস্পতিবারের সেই বিকেলটি এখন এক দুঃসহ স্মৃতি। তিনি বলেন, সেদিন ছুটির পর প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তিনি বিদ্যালয় থেকে বের হয়েছিলেন। বাগবাড়ি বাজারে পৌঁছানোর পর রনজিলা পারভিন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পাকা তাল কেনেন এবং বিদায় নেওয়ার সময় বলেন, ‘থাকেন, রোববার বিদ্যালয়ে আবার দেখা হবে।’ রিজনোবা আকতার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আজ রোববার ম্যাডাম কফিনে করে ফিরলেন, এই দৃশ্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।
রনজিলা পারভিনের আকস্মিক মৃত্যুতে বগুড়ার রহমাননগরের বাসায় এখন কেবলই কান্নার রোল। তাঁর একমাত্র মেয়ে তাকিয়া আকতার রাইসা নবম শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে সে স্তব্ধ হয়ে গেছে। রনজিলার বড় ভাই জাহিদ ইসলাম জানান, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বগুড়ায় আনার পর আজ বাদ জোহর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর গাবতলী উপজেলার তরফহরতাজ উত্তরপাড়ায় তাঁর স্বামীর বাড়ির পারিবারিক গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হবে। গাবতলীর নিজগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিদ্দিক মো. আবু বক্কর বলেন, রনজিলা পারভিন অত্যন্ত অমায়িক স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর এই অকালমৃত্যুতে এলাকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আজ তিনি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরেছেন, তবে লাশবাহী গাড়িতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিনে।.ছিনতাইকারীর কবলে প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় ‘প্যারা পনিরসহ’ গ্রেপ্তার ২.গতকাল শনিবার সকাল ছয়টার দিকে রাজধানীতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে ছিনতাইকারীদের হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান রনজিলা পারভিন।
আপনার মতামত লিখুন :