
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ তৎকালীন বিএনপির এই যুগ্ম-মহাসচিবকে ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তার সন্ধান মেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে। দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় জাতীয় নেতাকে এভাবে প্রকাশ্যে গুম করে সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তৎকালীন সময়ে পুরো দেশ হতবাক হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এখন সামনে এসেছে এই ঘটনার নেপথ্যের রোমহর্ষক কাহিনী। ঢাকার উত্তরায় যে ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ গুম হয়েছিলেন, সেই ফ্ল্যাটের মালিক এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ হাবিব হাসনাত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ৩ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা নিয়ে সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগ রাজধানীর ১৬ জায়গায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপির প্রায় সব সিনিয়র নেতাকে একে একে গ্রেফতার করা হতে থাকে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আন্দোলনের বিবৃতি দিয়ে যাওয়া রুহুল কবির রিজভী আহমেদ গ্রেফতার হওয়ার পর, সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদকে গ্রেফতারে মরিয়া হয়ে ওঠে র্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ অবস্থায় তিনি গুলশানের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান পরিবর্তন করে দলের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে গুলশানে তার অবস্থানের বিষয়টি গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলে তিনি এলাকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভেল্লাপাড়ার মিয়াবাড়ির সৈয়দ হাবিব হাসনাত, যিনি তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, তার উত্তরার ফ্ল্যাটে সালাহউদ্দিনকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে হাবিব হাসনাত নিজেই গাড়ি চালিয়ে গুলশানের একটি গোপন বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়ালকে উত্তরার ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। এ বিষয়ে হাবিব হাসনাত বলেন, ‘কথামতো বিকাল ৫টার দিকে আমি গাড়ি নিয়ে বের হলাম। গুলশানে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, তা আমরা খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানত না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী এবং দলের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতা শুধু বিষয়টি জানতেন। আমি ওই বাড়ির কিছুটা অদূরে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, পাশে একটি মিষ্টির দোকান আছে, তুমি গিয়ে মিষ্টি নিয়ে এসো।’ সেখানে তাদের দেখভালের জন্য একজন বাবুর্চি ও সহকারী নিয়োজিত করা হয়েছিল।
উত্তরার ওই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদ দলের পক্ষে বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকেন। তবে সালাহউদ্দিন আহমদকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে ৭ মার্চ তার দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরদিন ৮ মার্চ সালাহউদ্দিনের খোঁজে গুলশানের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এবং ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় র্যাব (উল্লেখ্য, সেই অফিস ও ফ্ল্যাটের মালিক সৈয়দ হাবিব হাসনাত)। অবশেষে ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩-বি নম্বর সড়কের নিরাপত্তাকর্মীরা পরে জানান, অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা সালাহউদ্দিনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হওয়ার পর হাবিব হাসনাত নিজের জীবন ও গুমের আশঙ্কায় এক কাপড়ে স্ত্রীসহ দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে খালেদা জিয়ার নির্দেশে ঘটনার সত্যতা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রাণনাশের হুমকি ও দেশে ফিরতে না দেওয়ার হুমকিতে তিনি তা করতে পারেননি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ফ্যাসিবাদের পতনের পর হাবিব হাসনাত দেশের ভবিষ্যৎ সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শুরু থেকেই নাটক ও আত্মগোপন বলে উপহাস করেছিল। ২০১৫ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন যে, সালাহউদ্দিনকে আট বস্তা ময়লার সঙ্গে কোথাও পাচার করা হয়েছে কি না, তার জবাব খালেদা জিয়াকেই দিতে হবে। পরবর্তীতে ১৩ মে শিলংয়ে তাকে উদ্ধারের দিনই আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দাবি করেছিলেন, এটি গুম নয়, বরং দলীয় প্রধানের নির্দেশে আত্মগোপন ছিল।
আপনার মতামত লিখুন :