Facebook Twitter Instagram YouTube

সংরক্ষিত নারী এমপিদের সাধারণ আসন দেওয়ার উদ্যোগ, আইন সংশোধন করছে সরকার


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ৩:১৮ অপরাহ্ণ /
সংরক্ষিত নারী এমপিদের সাধারণ আসন দেওয়ার উদ্যোগ, আইন সংশোধন করছে সরকার

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা থাকে না। তবে এবার তাঁদের এক বা একাধিক সাধারণ সংসদীয় আসনে ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা’ রাখার আইনি সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে একটি খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামের এই খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর এটি দ্রুত জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সরকারের এমন উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। লোকপ্রশাসন-বিশেষজ্ঞ ও সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার কথা বলে এ ধরনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এটি মূলত সংসদ সদস্যদের কাজই নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংরক্ষিত নারী সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না এবং তাঁদের কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই—এটি জেনেই দলগুলো তাঁদের মনোনয়ন দেয়। এখন আইন করে তাঁদের কোনো সাধারণ আসনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব-ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় বিদ্যমান আইনের ২৬ নম্বর ধারার পর নতুন ‘২৬ক’ ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে দায়িত্ব ও কার্যাবলি বণ্টন করা যাবে। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের দল বা জোট তাঁর জন্য এক বা একাধিক সাধারণ আসন বা কার্যক্ষেত্র নির্ধারণ করবে। আর তাঁর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কার্যাবলি ঠিক করবেন ওই দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান। সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত কোনো সদস্যের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের পর যেকোনো সময় এই দায়িত্ব বণ্টন করা যাবে। সিদ্ধান্তটি লিখিতভাবে স্পিকারকে জানাতে হবে, তবে এ ক্ষেত্রে স্পিকারের কোনো পূর্ব অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না, তাঁকে কেবল অবহিত করার বিধান রাখা হয়েছে।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্যদের ক্ষেত্রেও আসন ও দায়িত্ব নির্ধারণের নিয়ম খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দলীয় জোটভুক্ত স্বতন্ত্র সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্পিকার সংশ্লিষ্ট নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র নির্ধারণ করবেন। স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য না থাকলে ওই সংরক্ষিত নারী সদস্য নিজেই তাঁর পছন্দের আসন উল্লেখ করে স্পিকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে আবেদন বিবেচনা করে স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সংরক্ষিত নারী সদস্যদের জন্য এভাবে কার্যক্ষেত্র নির্ধারণ করা হলেও সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না। তবে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে সর্বোচ্চ কতটি সাধারণ আসনের দায়িত্ব দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে খসড়ায় কোনো সুনির্দিষ্ট সীমা উল্লেখ করা হয়নি। কোনো দল বা জোট কেবল নিজেদের জেতা সাধারণ আসন থেকেই সংরক্ষিত নারী সদস্যদের কার্যক্ষেত্র বেছে নিতে পারবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। ফলে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের জেতা আসন কিংবা বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলের জেতা আসন নিজেদের সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য বেছে নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এছাড়া একাধিক দল বা জোট যদি একই সাধারণ আসনে নিজেদের সংরক্ষিত সদস্যকে দায়িত্ব দেয়, তবে সেই বিরোধ কীভাবে মিটবে, তার কোনো বিধান খসড়ায় নেই। উন্নয়ন কার্যক্রমে ‘ভূমিকা’ বলতে ঠিক কী বোঝাবে এবং সরাসরি নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী সদস্যের ভূমিকা কীভাবে আলাদা করা হবে, তার কোনো কার্যপদ্ধতি না থাকায় মাঠপর্যায়ে ক্ষমতা ও সমন্বয়ের জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই আইন সংশোধনের উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আসনে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্ক। সম্প্রতি বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে বিরোধী দলের সদস্যদের ৭৯টি আসনে উন্নয়ন তদারকি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের জন্য দলটির সংরক্ষিত নারী সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই বণ্টনের মধ্যে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র সদস্যদের আসনও রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের মতো সংরক্ষিত নারী সদস্যদেরও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক অভিহিত করে বলা হয়, এটি নির্বাচনী এলাকায় অনর্থক রাজনৈতিক সংঘাত ও সমন্বয়হীনতা তৈরি করবে।

সংবিধান অনুযায়ী, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণের সরাসরি ভোটে ৩০০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সদস্যরা নির্বাচিত হন সাধারণ আসনের সদস্যদের ভোটে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। সেই অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে। এই সংরক্ষিত নারী সদস্যরা সাধারণ সদস্যদের মতোই আইন প্রণয়ন, সংসদীয় বিতর্ক ও স্থায়ী কমিটির কাজে অংশ নেন এবং সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অতীতেও একই আসনে সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সরাসরি নির্বাচিত একজন সদস্যের এলাকায় আরেকজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব দেওয়া হলে ক্ষমতা, বরাদ্দ ও সুপারিশ নিয়ে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী সদস্যকে যদি বিরোধী দলের জেতা আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দেবে।

আর দায়িত্ব–কার্যাবলি ঠিক করবেন তাঁর দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।.খসড়ায় বলা হয়েছে, সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য এমন কার্যক্ষেত্র নির্ধারণের কারণে সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দায়িত্ব ও অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না।.একজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে সর্বোচ্চ কতটি সাধারণ আসনের দায়িত্ব দেওয়া

আর ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে নারীদের জন্য ৫০ আসন সংরক্ষিত রয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo