Facebook Twitter Instagram YouTube

শেখ হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল বাংলাদেশে?


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৫, ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ /
শেখ হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল বাংলাদেশে?

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেবে, তা ২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকের কাছেই ছিল অকল্পনীয়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এটি ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ২ আগস্টের জন্য প্রার্থনা ও গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

২ আগস্ট ইউনিসেফ কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশু নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়ে বিশাল বিক্ষোভ করেন। একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেদিন নাহিদ ইসলামসহ ছয়জন সমন্বয়ক অভিযোগ করেন যে, ডিবি কার্যালয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আগের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল। একই দিন বিকেলে মোবাইল নেটওয়ার্কে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা পাঁচ ঘণ্টা পর সচল হয়। রাতে গণভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানালে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুকে জানান, ‘গুলি আর সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো সংলাপ হয় না।’

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করলেই হবে না; বরং খুন, লুটপাট, দুর্নীতি এদেশে হয়েছে তার বিচার হতে হবে।’ এদিন আন্দোলনকারীরা ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেনেটর ও কংগ্রেসম্যান বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেনকে চিঠি পাঠান।

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকার ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন জারি করে। এদিন সরকার আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি তাদের শক্ত হাতে দমনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। নাহিদ ইসলাম সারা দেশের জেলা, উপজেলা ও পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বান জানান।

৫ আগস্ট কারফিউর মধ্যেই ঢাকামুখী মানুষের ঢল নামে। সকাল থেকেই রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সামনে সেনা সদস্যরা কাঁটা তারের বেড়া দিলেও আন্দোলনকারীরা তা সরিয়ে রাজলক্ষ্মীর দিকে এগিয়ে যায়। দুপুর নাগাদ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে ভারতে পালিয়ে গেছেন। বেলা ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।’ তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে জনগণের আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনার পতনের পরপরই আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেন। প্রধান বিচারপতির বাসভবন, ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের স্মৃতি জাদুঘরসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসেবে এই পুরো সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০ এর বেশি হলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৪০০ এর কাছাকাছি। ৬ আগস্ট ভোর থেকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor