
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বৈরিতা নতুন করে সামনে এসেছে। বিশ্বমঞ্চে দেওয়া ভাষণে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কৌশলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকেন। তুর্কি বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক বৈধতা মুছে দেওয়ার একটি সুচিন্তিত আইনি ও নৈতিক কৌশল। নিজের বক্তব্যে এরদোয়ান গাজা পরিস্থিতি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ওপর জোর দিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান।
এর জবাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি এরদোয়ানকে ‘স্বৈরাচারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন যে তুরস্ক ইহুদিবিদ্বেষী মিথ্যা ছড়ানোর নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আঙ্কারা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসকে আশ্রয় দিচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করতেই বহু দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশন কক্ষ বর্জন করেন, যা ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরদোয়ানও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইস্তাম্বুলের এক অনুষ্ঠানে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের স্থান জাতিসংঘের মঞ্চে নয়, বরং আদালতের কাঠগড়ায় হওয়া উচিত।
দুই দেশের এই বিরোধ এখন আর কেবল মৌখিক যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের আগস্টে তুরস্কের বিচার বিভাগ নেতানিয়াহুসহ আরেক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলের কাছে আবেদন জানায়। এর আগে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজাগামী মানবিক সহায়তার জাহাজ ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ওপর ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই ইস্তাম্বুলের একটি আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। এছাড়া, তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পাশাপাশি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে。
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ প্রকাশ করেছেন যে তারা তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি ঠেকাতে প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে কাজ করছেন। স্মোটরিচের দাবি, এরদোয়ান অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তুরস্ক ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে কুর্দি নীতি ও হামাসকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এনে একটি মামলা প্রস্তুত করতে তাঁর আইনি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন।
আঞ্চলিক নানা ইস্যুতেও এই দুই দেশের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনে সেনা পাঠানোর ব্যাপারে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আগ্রহ প্রকাশ করলেও ইসরায়েল তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গাজায় তুর্কি বা কাতারি সেনাদের উপস্থিতি তারা মেনে নেবেন না। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও তুরস্ক যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ করছে, সেখানে ইসরায়েল সামরিক দখলদারিত্ব বাড়াচ্ছে। এমনকি ২০২৬ সালের আগস্টে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ঠেকাতে তুর্কি সীমান্তের কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল।
লেবাননে ২০২৬ সালের শেষে জাতিসংঘ মিশন ইউনিফিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তা জোরদারে তুরস্ক ভূমিকা রাখতে চাইলেও ইসরায়েল সেখানে ভেটো দেবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। অন্যদিকে, সাইপ্রাসকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও জটিল রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালে ইসরায়েল, গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাস প্রশাসনের (জিসিএ) মধ্যে একটি যৌথ সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি সামরিক তৎপরতা প্রতিহত করতে এই তিন পক্ষ মিলে একটি ‘র্যাপিড রিঅ্যাকশন ফোর্স’ গঠনের আলোচনা চালাচ্ছে, যা মূলত তুরস্ককে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল প্রতিটি ক্ষেত্রে তুরস্ককে একটি কৌশলগত বাধা মনে করে এবং তাকে দুর্বল করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি কোনো সাময়িক বিরোধ নয় যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতির কারণে আঙ্কারাকে এখন এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যেখানে সংঘাত কেবল একটি সম্ভাবনা নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা।
আপনার মতামত লিখুন :