Facebook Twitter Instagram YouTube

লাগামহীন অভিবাসন ব্যয়: সরকারি তালিকা থাকলেও মানছে না কেউ


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৭, ২০২৬, ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ /
লাগামহীন অভিবাসন ব্যয়: সরকারি তালিকা থাকলেও মানছে না কেউ

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, ভিসা-বাণিজ্য এবং অসাধু জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণে বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। কাগজে-কলমে বিদেশ পাঠানোর খরচ সরকার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। সরকারি তদারকির অভাব ও ১০ বছর আগের নির্ধারিত মূল্য বর্তমান বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় ভিসাপ্রত্যাশীদের নির্ধারিত খরচের তুলনায় ৫-৬ গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া, বাহরাইন ও আরব আমিরাতসহ ১৪টি দেশ এবং ২০১৬ সালে সৌদি আরবের জন্য অভিবাসন ব্যয়ের নোটিস জারি করেছিল। সেই অনুযায়ী, সৌদি আরবের জন্য এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, মালয়েশিয়ার কৃষি শ্রমিকের জন্য এক লাখ ৪০ হাজার টাকা, কাতারের জন্য এক লাখ টাকা এবং ওমানের জন্য এক লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া কাতারে কর্মী পাঠাতে এক লাখ টাকা, জর্ডানে এক লাখ ২৭৮০ টাকা, মিসরে এক লাখ ২০ হাজার, রাশিয়ায় এক লাখ ৬৬ হাজার, মালদ্বীপে এক লাখ ১৫ হাজার, ব্রুনাইয়ে এক লাখ ২০ হাজার এবং লেবাননে এক লাখ ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে এসব সরকারি ব্যয় নির্ধারণের পরও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশি-বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রধান বাধা। প্রবাসীরা জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য যে টাকা তারা ঋণ করে বা জমি বিক্রি করে জোগাড় করেন, তা তুলে আনতেই কয়েক বছর লেগে যায়। সুনামগঞ্জের রিসান আহমদ কাতারে নির্মাণ ভিসায় যেতে সাড়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করেছেন, যা সরকারি হারের তুলনায় অনেক বেশি। একইভাবে সৌদিপ্রবাসী রবিউল আলম বলেন, ২০২০ সালে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে প্রবাসে আসি। আসার পর কাজ ছিল না। ফলে ছয় মাস বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারিনি। বছর শেষে ইকামা খরচ তিন লাখ টাকা। বাড়িতে টাকা পাঠাব, নাকি ঋণ শোধ করব? নাকি ইকামা করব? কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে এখন আমি অবৈধ অবস্থায় আছি, গোপনে কাজ করে যাচ্ছি। সৌদিতে আমার মতো এমন অবৈধ কর্মী আছে কয়েক লাখ। আমরা দেশে গেলে একেবারে চলে যেতে হবে। বৈধ হতে হলে সাত-আট লাখ টাকা লাগবে। সেই আয় তো নেই। কেউ পাঁচ বছর, কেউ ১০ বছর ধরে এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। আমি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছি, কিন্তু জীবন এখানে শেষ করে দিচ্ছি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের গড় অভিবাসন ব্যয় ২০২২ সালে তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৩ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই ব্যয় মেটাতে একজন বাংলাদেশি কর্মীকে গড়ে ১০ দশমিক ২ মাসের আয় ব্যয় করতে হয়, যা ফিলিপাইনের ১ দশমিক ১ মাস বা ভিয়েতনামের ৭ দশমিক ২ মাসের তুলনায় অনেক বেশি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, ১০ বছর আগের নির্ধারিত হার বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, শ্রমবাজার সীমিত হওয়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য থাকায় অভিবাসন ব্যয় বাড়ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির স্বচ্ছতার জন্য রসিদ ব্যবহার এবং সার্ভিস চার্জ নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের জন্য ব্যয়ের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুত এ বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh