
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে দ্রুত শুল্ক আরোপের পথে হাঁটছেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা না করে তিনি বাণিজ্যিক ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে আগ্রাসী শুল্কনীতি গ্রহণ করেছেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ধাক্কা খাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তারা এখন আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পুরোনো বাণিজ্য আইনের ভিত্তিতে আরও স্থায়ী শুল্ককাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক পদক্ষেপে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি রোধে ব্যর্থতার অভিযোগে ৬০টি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি কেবল একটি সূচনা। আগামী মাসগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস ও শিল্পযন্ত্রের মতো কৌশলগত খাত এবং অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়ে আরও শুল্ক তদন্ত ও পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
কানাডার জ্বালানি কোম্পানি সেনোভাস এনার্জির সহযোগী প্রধান আইন উপদেষ্টা ড্যান উজকজো মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রথম অধ্যায় শেষ হয়ে আসছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব এসেছে। শুধু ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক থেকেই সরকার ১৬৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় করেছে, ক্রমবর্ধমান বাজেট–ঘাটতি সামাল দিতে যার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আগামী গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ তাঁর বাণিজ্যনীতির বড় অংশ কার্যকর হবে, যা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের আমদানি বাজার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশকে নতুন করে ছাড় দিতে হতে পারে।
গত শুক্রবার থেকে পুরোনো ১০ শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানিয়েছে, এই ব্যবস্থা মার্কিন আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে পরে আমদানিকারকদের অর্থ ফেরত দিতে হওয়ায় সেই হিসাব এখন ঋণাত্মক হয়ে গেছে। অন্যদিকে লেনদেন ভারসাম্যের সংকট মোকাবিলা আইনের আওতায় আরোপ করা ১৫০ দিনের অস্থায়ী শুল্ক থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত ৩১ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার রাজস্ব এসেছে। এটি মূলত ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতির একটি পুনর্গঠিত রূপ, যা আগে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিল।
শিল্প-ভর্তুকি ও রপ্তানিমুখী নীতির অভিযোগে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো ও ভিয়েতনামসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে ৩০১ নম্বর ধারায় তদন্ত চলছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, এই পরিবর্তন খুব একটা বড় নয়। মিশিগানের বিসেল ইনকরপোরেটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক বিসেলের মতে, শুল্কের হার প্রত্যাশিত সীমার মধ্যেই আছে।
ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি কোষাগারে শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব নিয়ে এলেও বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় এটি কতটা কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি বলেন, ট্রাম্প নতুন করে শুল্কপ্রাচীর তৈরি করছেন যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে এই পদক্ষেপে কিছু ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আদালতে মামলা করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, আইনি হাতিয়ার বদলালেও বাণিজ্যকৌশল একই থাকছে। তিনি আরও জানান, চীনের ওপর শুল্কহার ২০ শতাংশের বেশি হবে না।
এদিকে কানাডার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং স্পেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য বন্ধের হুমকির মতো আকস্মিক ঘটনাও ঘটছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঈশ্বর প্রসাদের মতে, ট্রাম্পের এই আকস্মিক শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যার নেতিবাচক প্রভাব মার্কিন পরিবার ও ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :