Facebook Twitter Instagram YouTube

হৃৎপিণ্ডের পরিচিত প্রতীক: উৎস ও বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক মিল


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ / ০
হৃৎপিণ্ডের পরিচিত প্রতীক: উৎস ও বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক মিল

ছোটবেলা থেকেই আমরা একটি নির্দিষ্ট আকৃতির হৃৎপিণ্ডের প্রতীক দেখে অভ্যস্ত। শিশুরা খাতা-কলম নিয়ে সহজেই এই চেনা ছবিটি আঁকে, যা তারা চারপাশে দেখে শেখে। তবে স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে যখন আসল হৃৎপিণ্ডের ছবি দেখা যায়, তখন বোঝা যায় যে এটি মোটেই সেই পরিচিত প্রতীকের মতো নয়, বরং এটি পেশিবহুল ও জটিল একটি মাংসপিণ্ড। প্রশ্ন জাগে, কেন আমরা আসল হৃৎপিণ্ডের পরিবর্তে এই কাল্পনিক আকৃতি ব্যবহার করি এবং কোথা থেকেই বা এই অদ্ভুত প্রতীকের প্রচলন হলো?

এই প্রচলিত প্রতীকটির সঠিক উৎস নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ‘জার্নাল অব ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন ইন মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় গবেষকেরা এর পেছনের ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মতে, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের হাত ধরেই মূলত হৃৎপিণ্ডের অদ্ভুত বর্ণনার সূচনা হয়। বিশেষ করে দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ভাবা হয়।

ডাচ নিউরোসার্জন ও লেখক পিয়েরে ভিঙ্কেনের মতে, হৃৎপিণ্ডের এই পরিচিত আকৃতির প্রাচীনতম ছবি ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি নথিতে পাওয়া যায়। মনে করা হয়, তৎকালীন শিল্পীরা অ্যারিস্টটলের দেওয়া বর্ণনার ওপর ভিত্তি করেই ওই আকৃতিটি এঁকেছিলেন। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, এটি মূলত ‘সিলফিয়াম’ নামের এক বিলুপ্ত উদ্ভিদের পাতার রূপ। উত্তর আফ্রিকার উপকূলে জন্মানো মৌরি-জাতীয় এই গাছটি প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা চিকিৎসা ও নানা কাজে ব্যবহার করত।

প্রতীকটি কীভাবে প্রথম চালু হয়েছিল, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও গবেষণার লেখকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, হৃৎপিণ্ডের বহুল পরিচিত এই প্রতীকটির সঙ্গে আসল মানব হৃৎপিণ্ডের গঠনের কোনো মিল নেই। তবে এটি নিয়ে কেউ ভাবেন না, কারণ এই চিত্রটি মূলত আবেগ ও স্নেহের প্রতীক হিসেবেই সবাই ব্যবহার করেন।

তবে এই প্রতীকের পেছনে যে চমৎকার এক বৈজ্ঞানিক সত্য লুকিয়ে আছে, তা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের আগে বিজ্ঞানীরাও টের পাননি। ১৫ ও ১৬ শতকে জনপ্রিয় হওয়া এই প্রতীকটির রহস্য উন্মোচিত হয় ১৯৫০-এর দশকে। সে সময় চিকিৎসকেরা হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির বা করোনারি ধমনিতন্ত্রের মডেল তৈরির জন্য মৃত মানুষের মহাধমনিতে বিশেষ প্লাস্টিক প্রবেশ করান। সেই প্লাস্টিকের ছাঁচ শুকিয়ে বের করার পর দেখা গেল, তা আশ্চর্যজনকভাবে হৃৎপিণ্ডের সেই কাল্পনিক প্রতীকের মতোই দেখতে।

এর কয়েক দশক পর করোনারি ধমনিতে বিশেষ রঞ্জক বা ‘ডাই’ ব্যবহার করে এক্স-রে বা পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালু হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে জানা যায় প্রথাগত প্রতীকটি আসলে কতটা নিখুঁত। গবেষকেরা জানান, হৃৎপিণ্ডের ডান ও বাম উভয় ধমনিতে একসঙ্গে রঞ্জক পদার্থ পাঠালে রক্তপ্রবাহের পুরো চিত্রটি ফুটে ওঠে। রক্তনালির এই শাখা-প্রশাখাগুলোর সম্মিলিত দৃশ্য আর আমাদের চেনা হৃৎপিণ্ডের প্রতীকের আকৃতি হুবহু এক।

এই পর্যবেক্ষণগুলো দেখে প্রশ্ন জাগে, প্রাচীনকালের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা কি আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করার হাজার বছর আগেই রক্তনালির এই নকশার কথা টের পেয়েছিলেন? এই সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে গবেষণার লেখকেরা অনুমান করছেন, সেই প্রাচীন পণ্ডিতেরা হয়তো প্লাস্টিকের বদলে প্লাস্টার বা অন্য কোনো প্রাথমিক উপাদান ব্যবহার করে মৃতদেহের হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির ছাঁচ তৈরি করে দেখেছিলেন। গবেষকেরা স্বীকার করেছেন যে তাঁদের এই তত্ত্বটি কেবলই এক অনুমান। তবে তাঁদের মতে, প্রাচীন আমলের সেই হৃৎপিণ্ডের প্রতীকের সঙ্গে আধুনিক রক্তনালির ছবির অদ্ভুত মিলের ব্যাখ্যা দিতে এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত যুক্তি হতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo