Facebook Twitter Instagram YouTube

খেলাপিদের বারবার ছাড়: কিস্তি ফেরাতে ব্যর্থ ব্যাংকিং খাত


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ণ /
খেলাপিদের বারবার ছাড়: কিস্তি ফেরাতে ব্যর্থ ব্যাংকিং খাত

দেশে খেলাপি ঋণ ও পুনঃ তফসিল করা ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। বারবার নীতিসহায়তা ও ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের আটকে থাকা টাকা ফেরত আসার হার সন্তোষজনক নয়। বরং বড় অংশের পুনঃ তফসিল করা ঋণ পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে কি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান সম্ভব, নাকি এটি কেবল ঋণগ্রহীতাদের বাড়তি সময় দিয়ে দায় এড়ানোর কৌশল।

সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো শিল্পগোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে। এর আগে এই সময়সীমা ছিল ১০ বছর। এই সুবিধার জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে এবং ব্যাংকগুলোকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। এমনকি যারা আগে বিশেষ বাছাই কমিটির মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছিল, তারাও পুনরায় আবেদনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানিসংকট, বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসার গতি কমে যাওয়ার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ মাসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিন টাকার এক টাকাই বর্তমানে খেলাপি।

গত দুই বছরে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ার একটি কারণ হলো পুরোনো ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাওয়া। রাজনৈতিক প্রভাব, আদালতের স্থগিতাদেশ, পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও ভুল শ্রেণীকরণের কারণে দীর্ঘদিন অনেক মন্দ ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর ঋণ পর্যালোচনা ও নিরীক্ষায় এসব ঋণের একটি অংশ সামনে চলে এসেছে।

পুনঃ তফসিলের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ৪২ শতাংশ আবার খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ পুনঃ তফসিল করা প্রতি পাঁচটি ঋণের প্রায় দুটি আবার খারাপ হয়েছে। ২০২০ সালে পুনঃ তফসিল করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হওয়ার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চার বছরের মধ্যে তা ৩৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সাম্প্রতিক হিসাবেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পরের তিন মাসে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের পর ডিসেম্বর শেষে তা ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নামে; কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে আবার তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা নতুন ঘটনা নয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সুদ মওকুফ ও সহজ কিস্তিতে খেলাপিদের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা কঠোর অবস্থান নেয়। কিস্তি বা ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং পুনঃ তফসিল করা ঋণগ্রহীতাদের নির্দিষ্ট সময় নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নিয়ম শিথিল করার অধ্যায় নতুন করে শুরু হয়। ২০১২ সালে সর্বোচ্চ তিনবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিশেষ সুবিধার আওতায় কোনো কোনো ঋণের পরিশোধের মেয়াদ ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ পুনর্গঠন কর্মসূচি চালু করা হয়। এ সময় ১১টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। তবে সুবিধাভোগীদের অধিকাংশই প্রথম কিস্তি সময়মতো দেয়নি।

এরপর বড় পরিবর্তন আসে ২০১৯ সালে। মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। তখনো বলা হয়েছিল, এটি বিশেষ ও এককালীন ব্যবস্থা। কিন্তু সেই এককালীন ব্যবস্থা একবারে শেষ হয়নি। করোনার সময় নিয়ম আরও শিথিল করা হয়। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। আর বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা মিলিয়ে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২৯ বছর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সুবিধাও দেওয়া হয়।

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে বিশেষ নীতিসহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছিল। তখন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২৪ নভেম্বর সুবিধার আওতা বাড়ানো হয়। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণও এই সুবিধার যোগ্য হয়। অশ্রেণিকৃত ও আগে পুনঃ তফসিল করা মেয়াদি ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত দুই বছর এবং এক্সিট সুবিধায় আরও এক বছর সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এর তিন মাস পর, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার নিয়ম আরও সহজ করা হয়। আবেদনের সময় নির্ধারিত ডাউন পেমেন্টের অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক পরবর্তী ছয় মাসে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এর তিন মাসের মধ্যে, ৭ মে আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন করা হয়। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট তা আবার বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে কখনো সুবিধার আওতা, কখনো ডাউন পেমেন্ট, কখনো আবেদনের সময়, আবার কখনো ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, নেপালে ছয় মাস নিয়মিত কিস্তি দিলেই খেলাপি ঋণ সরাসরি নিয়মিত হয় না। দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা মূলত সংকটে পড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা দিয়েছে, যেখানে ঋণগ্রহীতার পরিশোধ ক্ষমতা এবং ব্যবসা পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা থাকতে হয়। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে ব্যাংক যাচাই করে দেখে সংকটটি সাময়িক কি না, দেশটির ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৮ শতাংশ। পাকিস্তানে পুনঃ তফসিল করলেই ঋণ নিয়মিত হয়ে যায় না, সেখানে বকেয়ার কমপক্ষে ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হয় এবং দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বারবার সুবিধা দেওয়ার ফলে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে কিস্তি পরিশোধে অনাগ্রহ তৈরি হয়। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চেয়ে খেলাপি হয়ে নতুন সুবিধার অপেক্ষায় থাকা অনেকের কাছে বেশি লাভজনক মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অতীতের মতো সুবিধার অপব্যবহার যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সময় বাড়িয়ে বা কাগজে-কলমে ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না; এর জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি এবং সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo