
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম দেশের আমদানি-রপ্তানি ও শিল্প খাতের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই নগরীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না পেয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং একাধিক প্রতিষ্ঠান একই ধরনের হুমকির শিকার হচ্ছে, যা একটি সংগঠিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি এবং সামাজিক মাধ্যমে হুমকির অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে প্রশ্ন উঠছে—অপরাধীরা এই সাহস কোথায় পাচ্ছে? একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা। যখন কোনো ব্যবসায়ী ব্যবসা চালানো বা চাঁদাবাজদের সঙ্গে আপস করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাত চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তবে মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক বা দেশের বাইরে অবস্থান করুক, তাকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি করতে হবে। অপরাধীচক্রের অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও সহযোগীদের চিহ্নিত করতে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে আধিপত্য বিস্তারকারী সন্ত্রাসীচক্রের পৃষ্ঠপোষকদেরও খুঁজে বের করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও হুমকি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। অনেক সময় ভয় বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় অভিযোগ করতে দেরি হয়, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। এক্ষেত্রে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ও সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্কের কারণে এখানকার ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী অপরাধী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—রাষ্ট্রকে এই বার্তা স্পষ্ট করতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজচক্র ভেঙে দেওয়া এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ব্যবসার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তবেই দেশে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা শক্তিশালী হবে।
আপনার মতামত লিখুন :