কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতির মধ্যেই এর রানওয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সমুদ্রের বুকে সম্প্রসারিত রানওয়ের ‘ক্যাটাগরি-২ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেমের’ বৈদ্যুতিক তার ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বারবার চুরি হওয়ার ঘটনায় বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) গুরুত্বপূর্ণ অডিটের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই বিষয়টি সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আগামী সোমবার (২৬ অক্টোবর) কক্সবাজার বিমানবন্দরে আইকাওর এই অডিট হওয়ার কথা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরুর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি প্রথম উঠে আসে গত ৭ অক্টোবর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির (এনসিএএসসি) ১৪তম সভায়। সভায় সাগরবক্ষে স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের তার ও যন্ত্রাংশ বারবার চুরির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জানানো হয়, বিমানবন্দরের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে প্রায়ই এ ধরনের চুরির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রানওয়েতে উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণে অত্যাবশ্যকীয় এই লাইটিং সিস্টেমের সরঞ্জাম চুরি যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের নথিতেও এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় বারবার চুরির ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কক্সবাজার সদর মডেল থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো ধরনের অভিযোগ দায়ের করেনি। তাদের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবেও বিষয়টি জানানো হয়নি।”
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এই ঘটনাকে ‘চরম নিরাপত্তা-ঘাটতির বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “কেপিআই এলাকায় এ ধরনের যন্ত্রাংশ বা বৈদ্যুতিক তার চুরি হওয়া চরম নিরাপত্তা-ঘাটতির বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে আইকাওর অডিট যখন সামনে, তখন এ ধরনের ঘটনা দেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক। সমুদ্রের বুকে স্থাপিত এমন স্পর্শকাতর নিরাপত্তা-ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিমান নিরাপত্তার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং আইকাওর অডিটেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল জানিয়েছেন, এনসিএএসসির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের সমুদ্রবক্ষে স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এ ধরনের স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। বেবিচকের সুপারিশের পর বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং এ ঘটনায় নৌপুলিশের মাধ্যমে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সমুদ্রের বিস্তৃত এলাকায় স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থলভাগের কোনো স্থাপনা পাহারা দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশ, নজরদারি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টহল পরিচালনার মতো বিষয়গুলো এখানে বিবেচনায় নিতে হয়। তবে, এসব চ্যালেঞ্জ আগে থেকেই বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের যাত্রা শুরুর আগে কোটি টাকা মূল্যের লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চুরির নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করা এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আইকাওর অডিটের মাত্র কয়েক দিন আগে এই চুরি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা আসলে কতটা প্রস্তুত।
আপনার মতামত লিখুন :