
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক আবারও আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। এবার এর কারণ জার্মান পরিচালক উভে বোল নির্মিত সহিংস চলচ্চিত্র 'সিটিজেন ভিজিল্যান্ট'। হলিউড অভিনেতা আর্মি হ্যামার অভিনীত এই ছবিটি মুক্তির পর তেমন সাড়া না পেলেও, মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ এটি ৪৮ ঘণ্টার জন্য বিনামূল্যে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২২ সালে টুইটার কিনে এর নাম পরিবর্তন করে এক্স রাখেন ইলন মাস্ক। এরপর তিনি আগের অনেক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের নিয়ম বাতিল করেন। এই পদক্ষেপের ফলে অ্যাপল ও অ্যামাজনের মতো প্ল্যাটফর্মে সিনেমাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ছবিটির পটভূমি অত্যন্ত বিতর্কিত। এতে দেখা যায়, একজন আমেরিকান ব্যক্তি ইউরোপে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। তিনি পুলিশ, বিচারক, ধর্ষক ও একটি শরণার্থী পরিবারসহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন। তার দাবি, তিনি ইউরোপকে মুসলিম অভিবাসী ও তথাকথিত 'ওয়োক' রাজনীতির হাত থেকে রক্ষা করছেন। অত্যন্ত সহিংস ও রক্তাক্ত দৃশ্যের আধিক্যের কারণে জার্মান চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথমে ছবিটিকে রেটিং দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
মাস্কের এই প্রচারণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। তিনি একটি পোস্ট রিপোস্ট করে মন্তব্য করেন যে, অভিবাসীদের অপরাধের জবাবে সাধারণ মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়া 'মধ্যপন্থী প্রতিক্রিয়া'। সমালোচকদের মতে, একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে মাস্কের এই কর্মকাণ্ড সহিংসতা ও বিদ্বেষকে উৎসাহিত করতে পারে। তবে তার সমর্থকদের দাবি, তিনি কেবল মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করছেন।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক জর্জিওস সামারাস মনে করেন, মাস্ক এখন একটি আদর্শিক লড়াইয়ে নেমেছেন এবং নিজের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ধারণা ছড়িয়ে দিতে চান। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ শেষ করার পর মাস্ক এখন ইউরোপের রাজনৈতিক বিতর্কেও বেশ সক্রিয়।
চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের কাছেও তীব্র নিন্দার শিকার হয়েছে। ভ্যারাইটি সাময়িকী ছবিটিকে 'অবিশ্বাস্য রকমের খারাপ' এবং মার্কিন রক্ষণশীল লেখক রড ড্রেহার একে 'ফ্যাসিবাদী প্রচারণা' বলে আখ্যা দিয়েছেন। পরিচালক উভে বোলের দাবি, মাস্কের প্রচারের কল্যাণে ছবিটি প্রায় ৬ লাখ ডলার আয় করেছে।
মাস্কের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক কেবল সিনেমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী নেতা ও কর্মীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের মেরিন লে পেন এবং যুক্তরাজ্যের টমি রবিনসনের বক্তব্য ও ভিডিও শেয়ার করা নিয়ে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি 'রিমাইগ্রেশন' বা অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ধারণাকেও সমর্থন জানিয়েছেন। বার্লিনে প্রাইড অনুষ্ঠানে হামলার পর তিনি রিমাইগ্রেশনের বিরোধিতাকারীদের 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেন।
অনেকে মনে করেন, মাস্কের এই ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সমাজ ও রাজনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকের সাবেক মুখপাত্র গাওয়েইন টাউলারের মতে, ইউরোপের রাজনীতিতে মাস্কের প্রভাব সীমিত। সব মিলিয়ে, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা থেকে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম চরিত্রে পরিণত হওয়া ইলন মাস্কের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :