
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম শ্বাসরুদ্ধকর ও রোমাঞ্চকর এক ফুটবল লড়াইয়ের সাক্ষী হলো মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছে ইংল্যান্ড। ১০ গোলের এই অবিশ্বাস্য থ্রিলারে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল থমাস টুখেলের দল, যা গত ৬০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে ইংলিশদের সেরা সাফল্য। প্রথমার্ধে ইংল্যান্ড ৪-০ গোলে এগিয়ে থেকে ম্যাচটিকে একপেশে বানিয়ে ফেললেও, দ্বিতীয়ার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল ও বারকোলার লক্ষ্যভেদে রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ায় ফরাসিরা। তবে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে থ্রি লায়নরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই বিধ্বংসী রূপে হাজির হয় ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ। খেলা শুরুর মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ডেকলান রাইস। ফরাসিদের একটি দুর্বল পাস ইন্টারসেপ্ট করে বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন এই আর্সেনাল মিডফিল্ডার এবং দারুণ এক ইনসাইড-কাটে রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে নিখুঁত বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান। ম্যাচের ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কোনসা। ডেকলান রাইসের কর্নার থেকে ফরাসি ডিফেন্সের শিথিল মার্কিংয়ের সুযোগ নিয়ে দারুণ হেডে জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন অ্যাসটন ভিলার এই ডিফেন্ডার।
ফরাসি রক্ষণভাগের চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ইংল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন বুকায়ো সাকা। মার্কাস র্যাশফোর্ডের পাস থেকে বক্সে ঢোকার পর সাকা ফরাসি কিপার মাইক মেনিয়কে কাটিয়ে ফেললেও টার্ন নেওয়ার সময় রেফারির সাথে ধাক্কা খান। এরপর পাল্টা আক্রমণে রায়ান চেরকির শট ইংলিশ কিপার ডিন হেন্ডারসন ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বল আবার চলে যায় র্যাশফোর্ডের পায়ে। তার পাস থেকে সাকার নেওয়া জোরালো শট এক ফরাসি ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে জালে জড়ায়। প্রথমার্ধেই সাকার জোড়া গোল এবং রাইস ও কোনসার লক্ষ্যভেদে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় ইংল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় ফ্রান্স। ম্যাচের শুরুতেই মাইকেল ওলিসের পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ইংলিশ ডিফেন্সের বুক চিরে গোল করেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এটি চলতি বিশ্বকাপে তার নবম গোল ছিল। এর মাত্র সাত মিনিটের মাথায় ব্যবধান ২-৪ করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। মাঝমাঠ থেকে ইংল্যান্ডের এবেরেচি ইজে ফরাসি কিপারের মাথার ওপর দিয়ে লব করার ব্যর্থ চেষ্টা করার মাত্র ২০ সেকেন্ডের মাথায় বল কেড়ে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠে ফ্রান্স এবং বারকোলা বল জালে জড়ান।
ম্যাচের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেন এমবাপ্পে। হাইড্রেশন ব্রেকের ঠিক আগে উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান কম্বিনেশনে ইংলিশ রক্ষণভাগ ভেঙে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ফরাসি অধিনায়ক। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের ১০ম গোল করার পাশাপাশি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২টি গোলের বিশ্বরেকর্ড গড়েন এমবাপ্পে। স্কোরলাইন ৩-৪ হয়ে যাওয়ায় মায়ামির স্টেডিয়ামে টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের জয় সহজ করেন বুকায়ো সাকা। বক্সে ফাউলের কারণে পেনাল্টি পেলে প্রথমে জুড বেলিংহাম বল হাতে নিলেও সাকার হ্যাটট্রিকের সুযোগ করে দিতে উদারতা দেখিয়ে বলটি সাকার হাতে তুলে দেন। স্পট-কিক থেকে ফরাসি কিপার মাইক মেনিয়কে বোকা বানিয়ে বল জালের কোণায় জড়ান সাকা।
শেষ মুহূর্তের ইনজুরি টাইমে আবারও রোমাঞ্চ ছড়ায় ফ্রান্স। ডান প্রান্ত থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের মাপা শটে গোল করে স্কোরলাইন ৪-৫ করেন উসমান দেম্বেলে। তবে দেম্বেলের গোলের ঠিক দুই মিনিট পর পাল্টা আক্রমণ থেকে ফ্রান্সের বক্সে হানা দেয় থ্রি লায়নরা। ফরাসি রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা জুড বেলিংহাম নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ালে ৪-৬ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।
আপনার মতামত লিখুন :