
১০ আগস্ট ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এবারের পরীক্ষায় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছরের ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশের তুলনায় ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনাদায়ক বাস্তবতা। ফল প্রকাশের পরপরই রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্তত সাতজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যদিও প্রতিটি মৃত্যুকে সরাসরি আত্মহত্যা হিসেবে নিশ্চিত করা না গেলেও, ফলাফলের হতাশা ও কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর এই যোগসূত্র এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা ২০২৪ সালের ৩১০ জনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ১৯০ জন, প্রায় ৪৭ শতাংশ, ছিল স্কুলশিক্ষার্থী।
২৪৯ জন বা ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল নারী এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছর। কিশোর বয়সের এই শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক চাপ ও একাকিত্বের মতো জটিল কারণ থাকলেও, পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় এই মানসিক চাপের বিস্ফোরণ ঘটে। সমাজ ও পরিবার শিশুদের ছোটবেলা থেকেই জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়, ফলে নম্বরই তাদের আত্মপরিচয়ের পরিমাপক হয়ে ওঠে।
১৬৫টি জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য সংগ্রহ করেছে সংগঠনটি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হলেও ফলাফলের পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা হয় না। প্রতিযোগিতায় জেতার শিক্ষা দেওয়া হলেও হেরে যাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল শেখানো হয় না। অভিভাবক ও শিক্ষকদের উচিত ফল নিয়ে প্রশ্ন করার আগে সন্তানকে তার মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া। বিশেষ করে ফল খারাপ হলে সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা অপমান করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এছাড়া প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ফল প্রকাশের সময় বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করা সময়ের দাবি।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়ার। ঘটনার পদ্ধতির চেয়ে সংকট ও সহায়তার পথ তুলে ধরাই শ্রেয়। পরিশেষে, আমাদের সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন প্রয়োজন। সাফল্য ও ব্যর্থতাকে জীবনের চূড়ান্ত রায় হিসেবে না দেখে, সন্তানদের এটি বোঝাতে হবে যে, একটি পরীক্ষার ফল জীবন নির্ধারিত করতে পারে না। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি বার্তা—'তোমার ফল যা-ই হোক, তুমি আমাদের কাছে তার চেয়ে অনেক বড়।'
আপনার মতামত লিখুন :