Facebook Twitter Instagram YouTube

প্রিয় বস্তু উৎসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায় ইসলামে দানের প্রকৃত সৌন্দর্য


প্রকাশের সময় : জুলাই ১৯, ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ণ /
প্রিয় বস্তু উৎসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায় ইসলামে দানের প্রকৃত সৌন্দর্য

ইসলামে অর্থ-বিত্ত কুক্ষিগত করে না রেখে তা প্রাণ খুলে অভাবী ও অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্পদ জমিয়ে রাখার চেয়ে দান-বিসর্জনের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই ইসলাম উৎসাহিত করে। বিপরীতে, দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার শয়তানি কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে পবিত্র কোরআন। সুরা বাকারার ২৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ করে, আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফেরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ অথচ বর্তমান যুগে অনেক বিত্তশালী মুসলমানের অর্থ ইহুদি-খ্রিস্টানদের ব্যাংকে জমা হচ্ছে, যা সুদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোতে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুদের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে বহু দরিদ্র মানুষ বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। এই কঠিন সময়ে পাহাড়সম সম্পদ না জমিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানবসেবায় এগিয়ে আসাই ইসলামের মূল শিক্ষা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন মানেই কল্যাণকামিতা।’ (মুসলিম: ১০০)।

ইসলামের অন্যতম অনন্য সৌন্দর্য হলো অপরের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কার কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে যখন মুহাজিররা সবকিছু হারিয়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তখন মদিনার আনসার সাহাবিরা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও তাদের হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। নিজেদের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে মুহাজির ভাইদের অগ্রাধিকার দেওয়ার এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে আল্লাহ তায়ালা সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘তারা নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়, যদিও নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকে। যারা স্বভাবগত কার্পণ্য হতে মুক্তি লাভ করে, তারাই তো সফলকাম।’ সুরা দাহরের ৮ নম্বর আয়াতেও জান্নাতবাসীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা খাবারের প্রতি নিজেরা আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে।

দানের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের প্রিয় ও উৎকৃষ্ট বস্তুটি উৎসর্গ করা। অনেকেই নষ্ট বা অকেজো জিনিস দান করে তৃপ্তি পান, যা প্রকৃত দানের পরিপন্থী। সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর।’ এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম তাদের প্রিয় সম্পদ আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। মদিনার আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেজুর বাগানের মালিক আবু তালহা (রা.) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ‘বায়রুহা’ নামক বাগানটি আল্লাহর নামে সদকা করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বাগানটির সুপেয় পানি পান করতেন। আবু তালহা (রা.)-এর এই ত্যাগে খুশি হয়ে রাসূল (সা.) এটিকে একটি অত্যন্ত লাভজনক সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তা তাঁর নিকটাত্মীয় ও চাচার বংশধরদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যা তিনি সানন্দে পালন করেন (বোখারি: ১৪৬১)।

তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রিয় বস্তু দানের এই বিধান ফরজ ও নফল উভয় প্রকার দানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সুরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উপার্জিত উত্তম বস্তু থেকে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এমন বাজে জিনিস দিতে নিষেধ করেছেন যা নিজে প্রাপ্য হিসেবে পেলে কখনও চোখ বন্ধ না করে গ্রহণ করতেন না। তবে প্রিয় বস্তু ব্যয়ের অর্থ এই নয় যে সব সম্পদ উজাড় করে দিতে হবে, বরং যা দান করা হবে তা যেন ভালো ও প্রিয় হয়। প্রিয় বস্তু বলতে শুধু মূল্যবান জিনিস বোঝায় না, বরং সামান্য মূল্যের একটি খেজুরের দানাও যদি কেউ খাঁটি মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তবে সেও বিপুল সওয়াবের অধিকারী হবে।

যাদের অঢেল ধন-সম্পদ নেই, সেই নিঃসম্বল ও দরিদ্র ব্যক্তিরাও জিকির, কোরআন তেলাওয়াত এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে দান-সদকার সমপরিমাণ পুণ্য অর্জন করতে পারেন। প্রিয় বস্তু বলতে এমন জিনিসকে বোঝায় যা মানুষের কাজে লাগে এবং যা উদ্বৃত্ত বা অকেজো নয়। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা ব্যবহৃত জিনিস, যেমন পুরনো পোশাক বা অতিরিক্ত খাবার দান করলেও মানুষ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে না। কিন্তু দানের ক্ষেত্রে সবসময় নষ্ট বা অকেজো জিনিস দেওয়ার মানসিকতা মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং দানের আসল স্বরূপ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত, তাই লোক দেখানো মনোভাব পরিহার করে সাধ্যমতো উত্তম বস্তু দান করাই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ছয়. আয়াতের শেষাংশের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, প্রয়োজনাতিরিক্ত বস্তু ব্যয় করাও সওয়াবমুক্ত নয়। কোনো দান-খয়রাতই পুণ্যমুক্ত নয়। চাই তা প্রিয় বস্তু হোক বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। তবে দানের ক্ষেত্রে সব সময় নষ্ট, বিকৃত ও অকেজো বস্তু ব্যয় করার রীতি অবলম্বন করা মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রিয় বস্তুও ব্যয় করে এবং মাঝে মাঝে প্রয়োজনাতিরিক্ত বস্তু যেমন উদ্বৃত্ত খাদ্য, পুরনো পোশাক, ত্রুটিযুক্ত পাত্র এবং ব্যবহৃত পণ্যও দান করে, সেও অবশ্যই সওয়াবের অধিকারী হবে। সেই সঙ্গে আয়াতের শেষাংশে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, মানুষ যা ব্যয় করে, তার আসল স্বরূপ আল্লাহর অজানা নয়। সুখ্যাতি ও লোক দেখানো মনোভাব পরিহার করে তার সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে সাধ্যমতো ভালো উত্তম বস্তু দান করাই কাম্য। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন : ২/৯৩-৯৫)।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh