
ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা কোচ দিদিয়ের দেশঁর ১৪ বছরের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। শনিবার বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলে হারের পর তিনি ফ্রান্সের দায়িত্ব ছাড়েন। এর আগে মঙ্গলবার সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে ফ্রান্স বিশ্বকাপের শিরোপার লড়াই থেকে ছিটকে যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন জানায়, ২০২৬ সাল পর্যন্ত থাকা চুক্তি নবায়ন করবেন না দেশঁ, যা পরে কোচ নিজেও নিশ্চিত করেন।
দিদিয়ের দেশঁর জন্ম ১৫ অক্টোবর ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সের বায়োনে। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে নঁতের হয়ে ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে তার অভিষেক হয়। চার বছর পর তিনি অলিম্পিক মার্শেইয়ে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে তিনি জাতীয় দলের হয়ে প্রথমবার খেলেন। বোর্দোর হয়ে স্বল্প সময় খেলার পর আবার মার্শেইয়ে ফিরে আসেন। সেখানে ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে লিগ শিরোপা জেতেন এবং ১৯৯৩ সালে ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা অর্জন করেন।
১৯৯৪ সালে জুভেন্তাসে যোগ দেন দেশঁ। ক্লাবটির হয়ে তিনবার ইতালির লিগ শিরোপা জেতেন এবং ১৯৯৬ সালে ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা পুনরায় জয় করেন। ১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জেতেন তিনি। এরপর ২০০০ সালে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপও জয় করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার আগে চেলসিতে এক মৌসুম কাটান এবং ভ্যালেন্সিয়ায় খেলার পর ২০০১ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন।
কোচ হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে মোনাকোর প্রধান কোচ হিসেবে। ২০০৩ সালে তিনি ফ্রান্সের লিগ কাপ জেতান এবং ২০০৪ সালে মোনাকোকে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে নিয়ে যান, যদিও ফাইনালে পোর্তোর কাছে ৩-০ গোলে হারে দলটি। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাজে শুরুর কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। ২০০৬ সালের জুলাইয়ে ম্যাচ পাতানোর কেলেঙ্কারির কারণে দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যাওয়া জুভেন্তাসের দায়িত্ব নেন। বেশ কয়েকজন তারকা খেলোয়াড়কে দলে ধরে রেখে নয় পয়েন্ট জরিমানার পরও দলকে আবার শীর্ষ লিগে ফিরিয়ে আনেন, তবে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিরোধের কারণে পদত্যাগ করেন। ২০০৯-১০ মৌসুমে মার্শেইয়ের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম মৌসুমেই দলকে ফ্রান্সের লিগ শিরোপা জেতান। ২০১১ সালে দলকে দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে যান এবং ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার লিগ কাপ জয় করেন।
২০১২ সালের জুলাইয়ে লরাঁ ব্লাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ফ্রান্সের প্রধান কোচ হন দেশঁ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন। ২০১৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সকে ফাইনালে তুললেও অতিরিক্ত সময়ে পর্তুগালের কাছে হেরে যায় দলটি। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি, যেখানে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারায় ফ্রান্স। এর মাধ্যমে মারিও জাগালো ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকায় বিশ্বকাপ জয়ী তৃতীয় ব্যক্তি হন তিনি। ২০২০-২১ মৌসুমের উয়েফা নেশন্স লিগে স্পেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তোলেন, তবে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হারে দলটি। ২০২৪ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমের নেশন্স লিগে ফ্রান্স গ্রুপের শীর্ষে থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারালেও সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ৫-৪ গোলে হারে। প্রধান কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২০টি জয়ের রেকর্ড রয়েছে দেশঁর। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স জাতীয় দলের একটি সফল যুগের অবসান হলো।
আপনার মতামত লিখুন :