
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নবগঠিত সামরিক জোট ‘মক্কা চুক্তিতে’ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ প্রকাশ দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই জোটে যোগ দিলে কেবল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অন্যান্য পরাশক্তি ও সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গেও ঢাকার সম্পর্কের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানানোর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মক্কা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে সবসময়ই আলাদা একটি স্থান রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় যদি ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তবে সেখানে বাংলাদেশের যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবেই দেখছে। এই আলোচনার মধ্যেই আগামী ২৭ আগস্ট জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওআইসির মন্ত্রী পর্যায়ের জরুরি সভায় যোগ দিতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তবে রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি নতুন নিরাপত্তা জোটে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা এবং দেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়গুলো সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশ সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে কোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সামরিক বলয়ে জড়ানো এড়িয়ে চলে।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তিন দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করে। নেটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো—সদস্য কোনো দেশে সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। মূলত পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠিত হয়েছে। নেটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের এই জোটে অন্য দেশগুলোর জন্যও যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া মনে করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সামরিক ব্লকে যোগ দিলে বাংলাদেশ কার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে—সেই প্রশ্নটি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। এটি ভারতের পাশাপাশি চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতি মূলত বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বলয়ে যুক্ত হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। বর্তমান তারেক রহমানের সরকার নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও বেশ কিছু বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার করা অনুরোধের জবাবে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এই মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের বৈরী দেশ পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়াকে নয়াদিল্লি সহজভাবে নাও নিতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকাকে এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :