Facebook Twitter Instagram YouTube

আইসোটোপ সংকটে সারাদেশে পরমাণু চিকিৎসা ব্যাহত, চরম ভোগান্তিতে জটিল রোগীরা


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ / ০
আইসোটোপ সংকটে সারাদেশে পরমাণু চিকিৎসা ব্যাহত, চরম ভোগান্তিতে জটিল রোগীরা

আমদানি ও সরবরাহে চরম জটিলতার কারণে বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের তীব্র সংকট। এর ফলে দেশজুড়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোতে ক্যানসার, কিডনি ও থায়রয়েডসহ বিভিন্ন জটিল রোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় উপাদান না থাকায় অনেক রোগী টাকা জমা দিয়ে কিংবা সিরিয়াল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় আছেন। ক্ষেত্রবিশেষে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০ ২৭ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে, যার ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের পরবর্তী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংকট মূলত ক্যানসারের ব্যাপ্তি শনাক্তকরণে ব্যবহৃত বোন স্ক্যান, কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষার ডিটিপিএ রেনোগ্রাম এবং থায়রয়েড ও প্যারাথায়রয়েড স্ক্যানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (ইনমাস) সপ্তাহে সাধারণত তিন দিন ডিটিপিএ রেনোগ্রাম পরীক্ষা করানো হতো। তবে আইসোটোপের অভাবে বর্তমানে এ পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এখানে প্রায় ২০০ জন রোগী ফি জমা দিয়ে সিরিয়াল পেয়েছেন এবং আরও অন্তত ১০০ জন ফি জমা না দিয়ে অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। একইভাবে বোন স্ক্যান ও থায়রয়েড পরীক্ষার সিরিয়াল থাকা সত্ত্বেও সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার হাড়ে ছড়িয়েছে কি না তা নির্ধারণের অত্যন্ত জরুরি পরীক্ষা ‘বোন স্ক্যান’ দেশের হাসপাতালগুলোতে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ক্যানসার আক্রান্তরা চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ময়মনসিংহের ক্যানসার রোগী চম্পা আক্তার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে বোন স্ক্যান করাতে গিয়ে কোথাও সুযোগ পাচ্ছেন না, এমনকি পরীক্ষাটি কবে নাগাদ চালু হবে সে সম্পর্কেও কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। একই ধরনের সংকটে ভুগছে লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত ১৬ বছর বয়সী সানজিদা নবি আদৃতার পরিবার। চিকিৎসকের নির্দেশিত ডিটিপিএ রেনোগ্রাম পরীক্ষা করাতে না পেরে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবারটি।

আইসোটোপ সংকটের কারণ বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে তেজস্ক্রিয় উপাদানের সরবরাহ ব্যাহত হতে শুরু করে। প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময় রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট আইসোটোপের আমদানি ও সরবরাহ বন্ধ থাকে; চলতি বছর ১৩ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বিরতির কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের বেশি দিন পেরিয়ে গেলেও আমদানিকৃত উপাদান দেশে পৌঁছায়নি। আন্তর্জাতিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ দীর্ঘ মেয়াদে মজুদ রাখার কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণত দক্ষিণ আফ্রিকার সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বাংলাদেশে এগুলো আমদানি করা হয়। ফলে আমদানির শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর সার্বিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

দেশে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ আমদানি, স্থানীয় উৎপাদন এবং চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহের মূল দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। তাদের অধীনস্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস) ও ইনমাসসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে রোগ নির্ণয়ে এই উপাদান ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসকরা জানান, জটিল রোগের গতিপ্রকৃতি বোঝা, চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা বা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে সময়মতো ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফল অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় পরীক্ষা বন্ধ থাকলে শুধু চিকিৎসা শুরু বা পরিচালনাই পিছিয়ে যায় না, বরং রোগীদের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ভারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।

এদিকে আইসোটোপ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং পরীক্ষা পুনরায় চালুর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। জানা গেছে, সাংবাদিকদের সাথে কথা না বলার বিষয়ে কমিশনের কর্মকর্তাদের ওপর কড়া নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক (জীববিজ্ঞান বিভাগ) ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহফুজা খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।’ পরবর্তীতে সরবরাহের তারিখ সম্পর্কে ফের জানতে চাইলে তিনি চেয়ারম্যানের পিএস মোহাম্মদ সামসুদ্দোহাকে ডাকেন, যিনি প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হয়ে ধমক দেন এবং সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। ফলে ঠিক কবে নাগাদ দেশে আইসোটোপের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০২৭ সাল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।ময়মনসিংহের ক্যানসার আক্রান্ত চম্পা আক্তার এমন পরিস্থিতির শিকার।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy