
গলার সামনের অংশের নিচের দিকে অবস্থিত হরমোন গ্রন্থি থাইরয়েড। এই গ্রন্থির কোনো অংশে কোষের সংখ্যা অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে বৃদ্ধি পেলে তাকে থাইরয়েড ক্যানসার বলা হয়। সাধারণত থাইরয়েড গ্রন্থি কোনো কারণে বড় হয়ে গেলে তাকে গলগণ্ড বলে। আবার এই গ্রন্থির কোনো অংশ যদি টিউমারের মতো ফুলে ওঠে, তবে তাকে থাইরয়েড নডিউল বলা হয়ে থাকে। তবে আশার কথা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই নডিউল বা ফুলে ওঠা অংশ ক্যানসার নয়।
থাইরয়েড ক্যানসার যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে ক্যানসার কোষ এসে থাইরয়েডে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমেও এটি হতে পারে। এছাড়া রেডিয়েশন বা বিকিরণ এবং রেডিও, টেলিভিশন বা মোবাইল ফোন টাওয়ারের অস্বাভাবিক মাইক্রোওয়েভের মতো অদৃশ্য শক্তির কারণেও থাইরয়েড ক্যানসার দেখা দিতে পারে। আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার গতিতেও এই ক্যানসার হতে পারে।
এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে গলার সামনের অংশ শক্ত হয়ে ফুলে যাওয়া। সেখানে এক বা একাধিক টিউমার হতে পারে, যা গলার উভয় পাশেও দেখা দিতে পারে। এছাড়া আশপাশের লিম্ফ নোডগুলো ফুলে যাওয়া, আক্রান্ত স্থানে ব্যথা হওয়া, লালচে ভাব দেখা দেওয়া কিংবা ভেতরে রক্তক্ষরণ হওয়ার মতো লক্ষণও দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন কমে যাওয়া, খাওয়ার অরুচি, গিলতে অসুবিধা, কাশি বা গলার ভেতর চুলকানি হতে পারে। পাশাপাশি গলার স্বর মোটা বা ফ্যাসফেসে হওয়া এবং শ্বাসনালির ওপর চাপের কারণে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে থাইরয়েড ক্যানসার থেকে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। তাই গলায় কোনো ফোলা ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে এটি টিউমার, পানি নাকি রসের থলি তা সনাক্ত করা যায়। আল্ট্রাসনো রিপোর্টে ক্যানসারের লক্ষণ মনে হলে এফএনএসি বা বায়োপ্সি করা প্রয়োজন। রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিজ্ঞ সার্জন প্রয়োজন মনে করলে থাইরয়েড গ্রন্থিটি সম্পূর্ণ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দেন। অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার কোষের সম্পূর্ণ নির্মূল নিশ্চিত করতে রেডিও আয়োডিন থেরাপি বা রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। কোনো কোনো রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শে আজীবন থাইরয়েড হরমোন ওষুধ হিসেবে সেবন করতে হতে পারে।
থাইরয়েড ক্যানসার প্রতিরোধে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। থাইরয়েড নডিউল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্যানসারের প্রবণতা আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। গলা বা তার আশপাশে রেডিয়েশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে এবং শিশু-কিশোরদের অতি প্রয়োজন ছাড়া রেডিওথেরাপি দেওয়া যাবে না। এছাড়া ভেজাল খাবার পরিহার করা উচিত। যেহেতু এই ক্যানসারের পেছনে পারিবারিক ইতিহাসও জড়িত থাকে, তাই মা-বাবার এই রোগ থাকলে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
নিবন্ধটি লিখেছেন ঢাকা সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের রেডিয়েশন ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট। তিনি ঢাকার ফার্মগেটের আল-রাজি হাসপাতালেও নিয়মিত রোগী দেখে থাকেন।
আপনার মতামত লিখুন :