
জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হবে কি না, সে প্রশ্নের কোনো সুরাহা হয়নি। গত রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে অনির্ধারিত এই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কের জেরে ওই দিন নতুন কোনো সংসদীয় কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি, কেবল চারটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিরোধী দল যদি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের সভাপতি পদ দিতে কোনো আপত্তি নেই। এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে হবে। সরকারি দল মনে করে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি তুললেও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করা বিরোধী দলের একটি বিপরীতমুখী অবস্থান। অন্যদিকে, বিরোধী দল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার প্রস্তাব তারা সঠিক মনে করে না। তারা সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেবে না। তবে জুলাই সনদ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর প্রায় ২৬ শতাংশ সভাপতি পদ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
জাতীয় সংসদে বর্তমানে ১১টি বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এ পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হলেও কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদটি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি হলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, 'রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল' হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় সদস্যদের দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আসন সংখ্যা অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচজনের নাম দিতে বলা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি এবং কমিটিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠন-সংক্রান্ত কার্যসূচিতে যাওয়ার আগে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম দাবি করেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হয়েছে এবং তারা কমিটিতে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন। এই দাবি অস্বীকার করে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, তিনি টেলিফোনে কথা বললেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেওয়ার কথা বলেননি। তিনি মন্তব্য করেন, একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পর্কিত হতে পারে না এবং সংসদে কোনো বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হোক তা তারা চান না। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদ চলবে এবং এর মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়া সুন্দর হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম আবার বলেন, জিয়াউর রহমানের সময় কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল এবং এবারও তা দেওয়া হয়েছে। অন্য কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার রেওয়াজ নেই। তবে সংবিধান সংশোধনে অংশ নিলে তারা তা দিতে রাজি। এর জবাবে তাহের বলেন, সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নীতিগত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিরোধী দলকে আগে ডেপুটি স্পিকার পদের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা তা নেননি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সে অনুযায়ী পদ বণ্টন করা হবে। সবশেষে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে উভয় পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এবং প্রয়োজনে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রুদ্ধদ্বার আলোচনার আহ্বান জানান।
আপনার মতামত লিখুন :