
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে নয় দফা সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে দলটির কেন্দ্রীয় সচিবালয় ও নির্বাচন পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রতিনিধিদল এই দাবিগুলো তুলে ধরে।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে কমিশনের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দাবি করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কমিশন কোনো বিশেষ দলীয় সরকারের চাপের মুখে কাজ করছে কি না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণের প্রত্যাশা এবং নাগরিক সমাজের পর্যালোচনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জামায়াতের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বাতিল করা। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও স্থানীয় উভয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভোটাধিকার প্রয়োগে অংশগ্রহণ করে আসছেন। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও শিক্ষকরা প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এ অবস্থায় শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকে বৈষম্যমূলক মনে করছে জামায়াত। দলটির দাবি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যথায় বিষয়টি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে দলটি।
বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও দাবি জানানো হয়, যেসব রাজনৈতিক দলের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেই দলগুলোর পদ-পদবিধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত নয়। নির্বাচনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং জনমনে আস্থা বজায় রাখার স্বার্থে নিষিদ্ধ সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। তবে শুধু কোনো দলের সাধারণ সমর্থক হওয়ার কারণে কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার বিষয়ে তারা কোনো দাবি জানায়নি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সম্প্রতি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও বৈঠকে আপত্তি জানায় জামায়াত। গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তা সরাসরি বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক সাব-কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একটি সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এমন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কোনো ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এ বিষয়ে আগের বৈঠকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। কমিশন বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করলেও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন নয় এমন যুক্তিতে বিষয়টি সরকারকে জানানোর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। জামায়াতের পক্ষ থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগ দ্রুত বাতিল করার জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে দলটি। উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জামায়াত বলেছে, এসব নিয়োগ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি অর্থ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে প্রশাসকরা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারেন। এ কারণে নির্বাচনি পরিবেশে সমতা নিশ্চিত করতে এসব পদে নিয়োজিত প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
জামায়াত পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কোনো প্রশাসক পদত্যাগ করলেও তাকে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত নয়। তাদের যুক্তি, তফসিল ঘোষণার আগে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তি পদত্যাগ করলেই তার আগের অবস্থানের প্রভাব বা সুযোগ পুরোপুরি দূর হয়ে যায় না। তাই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে কঠোর ও সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োজন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশগ্রহণ বন্ধে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, ক্ষমতাসীন বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যক্তিদের প্রচারণায় সরাসরি অংশগ্রহণ নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় প্রার্থীদের মধ্যে অসম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বৈঠক শেষে গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন তাদের কিছু দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে অসহায়ত্বের কথাও জানানো হয়েছে। তারপরও জামায়াত আশা করছে, জনমত, নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে না। দলের আগ্রহী ব্যক্তিরা নিজ নিজ এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ সময় জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ওই রাজনৈতিক ঐক্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য গঠিত হয়েছিল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য নয়। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের মতো কোনো দলীয় সমঝোতা বা বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
আপনার মতামত লিখুন :