
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৫২ (01-09-2026, 14:52)
গত ৭ আগস্ট তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা প্যাক্ট’ মুসলিম বিশ্বে নতুন আশার সঞ্চার করার পাশাপাশি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই জোটের দরজা অন্যান্য দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আরব শক্তি হিসেবে মিসরকে এই জোটে যুক্ত করার বিষয়ে তুরস্ক আগ্রহ দেখিয়েছে। এ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক এবং মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনাও হয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং মিসরের রাজনীতিতে আমিরাতের প্রভাবের কারণে দেশটির এই জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি হয়তো আশানুরূপ দ্রুত নাও হতে পারে।
মক্কা প্যাক্ট ঘোষণার পর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম দ্রুততম সময়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও স্বাধীনতার আগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটি রাষ্ট্র ছিল, যার মাঝখানে অবস্থান করছিল ভারত। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো থাকলেও, পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক সহজ হতে দেয়নি ভারত। বিগত সরকারগুলো জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে ভারতের সঙ্গে অসম সহযোগিতাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
তবে বর্তমান বাংলাদেশ তার পূর্বের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যে বাংলাদেশকে প্রায় ‘চাবিসহ ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে’ বলে মনে করা হতো, সেই বাংলাদেশ এখন প্রথমবারের মতো নতুন জোটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং নিজের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করছে। এই নতুন যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়াকে দেখছে ঢাকা। এর ফলে অতীতে যেমন ভারত দুই পাকিস্তানের মাঝে অবস্থান করত, এখন আবার যেন ভারত নিজেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী এক নতুন ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা নয়াদিল্লিকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরবের গুরুত্ব অপরিসীম। পাশাপাশি এ দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে দেশটির গভীর ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, তুরস্ক বাংলাদেশের সামনে আধুনিক ও সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি বড় বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি হয়েছে; স্থবিরতা কাটিয়ে বাণিজ্য, কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে।
ভারতের দৃষ্টিতে মক্কা প্যাক্ট এখন আর সাধারণ কোনো চুক্তি নয়। ঢাকায় শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু সরকারের পরিবর্তন ছিল না, বরং বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের নীতির একটি প্রধান স্তম্ভের পতন। ভূরাজনৈতিক গবেষকদের মতে, এটি একই সঙ্গে ইসরাইল-ভারত কৌশলগত সমীকরণের জন্যও একটি বড় আঘাত। নিরাপত্তা विशेषज्ञोंর দৃষ্টিতে এই নতুন সমীকরণ ভারত, ইসরাইল এবং অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশলগত অক্ষের জন্য একটি বড় ধরনের ভূকম্পনের মতো পরিবর্তন।
প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে চীনের পর এখন তুরস্কও বাংলাদেশে আরও সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করছে। তুর্কী সাংবাদিক ও গবেষক আরদান জেনতুর্কের মতে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পেছনে বাংলাদেশের অনেক স্বার্থ রয়েছে। মক্কা প্যাক্টের সদস্য হওয়া বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যা দেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
আপনার মতামত লিখুন :