Facebook Twitter Instagram YouTube

স্পট মার্কেটে সাড়া মেলেনি, সেপ্টেম্বরেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো কঠিন


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ৩:১৫ অপরাহ্ণ /
স্পট মার্কেটে সাড়া মেলেনি, সেপ্টেম্বরেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো কঠিন

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (01 September 2026), ১২:০০ এএম

দেশের শিল্পকারখানা বাঁচাতে ও গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের জন্য কোনো সরবরাহকারী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিতে রাজি হয়নি, আর শেষ সপ্তাহের জন্য যে দাম চাওয়া হয়েছে তা অস্বাভাবিক চড়া। ফলে সেপ্টেম্বরজুড়ে দেশজুড়ে গ্যাসের রেশনিং বা সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে চার কার্গো এলএনজি আমদানির জন্য গত রোববার রাতে দরপত্র আহ্বান করেছিল রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)। সোমবার বিকেল ৪টার পর সেই দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে দেখা যায়, ৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবরের সরবরাহ সূচির জন্য কোনো কোম্পানিই দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি। অন্যদিকে, ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৫-৬ অক্টোবরের সরবরাহের জন্য যে দুটি প্রস্তাব এসেছে, সেগুলোতে প্রতি ইউনিটের দাম চাওয়া হয়েছে ২৫ দশমিক ৯২ ডলার। জাপান-কোরিয়া প্রাইজ ইনডেক্স (জেকেএম) অনুযায়ী যেখানে সেপ্টেম্বর মাসের এলএনজির স্বাভাবিক দাম প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলার হওয়ার কথা, সেখানে প্রায় ২৬ ডলারের এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও হতাশাজনক বলে মনে করছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

এর আগে সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ব্ল্যাক কিউব ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি কোম্পানির এক কার্গো এলএনজি দেওয়ার কথা ছিল। তবে তারা এখনো কার্গো সরবরাহের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয়নি। এই অনিশ্চয়তার কারণে বিকল্প হিসেবে আরপিজিসিএল স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এর ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে গ্যাসের তীব্র রেশনিং চলতে পারে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাধারণত জেকেএম ইনডেক্স ধরেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হয়। খুব কম সময়ে সরবরাহ দিতে হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু প্রতি ইউনিটে ২ থেকে ৩ ডলারের ব্যবধান বেশ চিন্তার বিষয়। এর আগে আগস্টেও প্রতি ইউনিট ২৫ ডলারের বেশি দামের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেনি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বর্তমানে প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

স্পট মার্কেটে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশায় সোমবার রাতেই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত মূল্যের কারণে এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়। এদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ সূচি অনুযায়ী বেশ কয়েকটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে আজ (১ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরামকোর একটি কার্গো আসার কথা। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকোর দ্বিতীয় কার্গো, ১৩ সেপ্টেম্বর পসকো, ১৬ সেপ্টেম্বর গানবোর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানবোর কোম্পানির আরও একটি কার্গো আসার সূচি রয়েছে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চলতি মাসে আরও অন্তত দুটি কার্গোর প্রয়োজন ছিল।

দেশে বর্তমানে দৈনিক গড়ে ২৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৭১ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যদিও এগুলোর মোট সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চড়া দামের কারণে সরকারের লোকসানের বোঝা পাহাড়সম হচ্ছে। প্রতি মাসে আমদানিকৃত ১০টি কার্গোর মধ্যে ৭ থেকে ৮টি কেনা হয় স্পট মার্কেট থেকে। স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গোর জন্য প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হলেও তা বিক্রি করে সরকারের আয় হয় মাত্র ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্গোতে লোকসান দাঁড়ায় ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। এই হিসাবে প্রতি মাসে এলএনজি আমদানিতে সরকারকে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের উচ্চমূল্য বজায় থাকলে এলএনজি আমদানিতে সরকারের মোট লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা। আগস্ট মাসে এলএনজি আমদানির জন্য পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। সেপ্টেম্বরের ভর্তুকির অর্থ চেয়েও দ্রুতই অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে। দাম বাড়ার কারণে বর্তমানে প্রতি ইউনিট মিশ্রিত (দেশি ও এলএনজি) গ্যাসের প্রকৃত উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ৪৫ টাকা, যা মাত্র ছয় মাস আগেও ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার এই গ্যাস গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে মাত্র ২৩ টাকা ৯০ পয়সা ইউনিটে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor