Facebook Twitter Instagram YouTube

হাওরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন আশার আলো ব্রি ধান-১১৮


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ /
হাওরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন আশার আলো ব্রি ধান-১১৮

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ‘ব্রি ধান-১১৮’ নামে একটি নতুন বোরো ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা মূলত হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের বিজ্ঞানীদের মতে, এই জাতটি স্বল্পমেয়াদি এবং নিম্ন তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। হাওরাঞ্চলে আগাম রোপণ করলে শীতের কারণে ধানের ক্ষতি এবং দেরিতে রোপণ করলে আকস্মিক বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তা এই নতুন জাতের মাধ্যমে অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. খন্দকার মো. ইফতেখারউদ্দৌলা জানান, ‘ব্রি ধান-১১৮’ বিশেষভাবে হাওরাঞ্চলের জন্য তৈরি করা হয়েছে। প্রজনন পর্যায়ে টানা সাত থেকে ১০ দিন গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলেও এই জাতটি টিকে থাকতে পারে। এটি শীতজনিত ‘চিটা’ পড়ার সমস্যা কমিয়ে দেয়, যার ফলে ধানের শীষে দানা পূর্ণ থাকে এবং ফলন ভালো হয়।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে এই জাতটি পরিপক্ব হতে ১৪৫ থেকে ১৫০ দিন সময় নেয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোপণ করলে এপ্রিলের শুরুতেই ফসল কাটা সম্ভব, যা হাওরাঞ্চলের বার্ষিক আকস্মিক বন্যার আগেই কৃষকদের ধান ঘরে তোলার সুযোগ করে দেয়। হেক্টরপ্রতি এই ধানের গড় ফলন প্রায় ৬ দশমিক ৮ টন, যা জনপ্রিয় ‘ব্রি ধান-২৮’-এর চেয়ে ১ দশমিক ১ টন বেশি। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এর ফলন ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এই জাত উদ্ভাবনকারী দলের নেতৃত্বদানকারী ব্রির হবিগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথি বিশ্বাস জানান, কয়েক বছরের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবমুক্ত করা এই জাতটি কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আগামী বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের ৫০টি উপজেলায় পাঁচ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ১০০টি করে প্লট থাকবে এবং অফ-সিজন বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে মানসম্মত বীজ বিতরণের প্রস্তুতি চলছে।

ড. বিশ্বাস আরও জানান, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগাম রোপণ করলে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ টন এবং ১৫ থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে রোপণ করলে প্রায় ৮ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। এছাড়া, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকার ইতোমধ্যে নগদ ও খাদ্য সহায়তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

২০২৬ সালের মে থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ মাসব্যাপী ৪ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বাজেটের একটি সম্প্রসারণ কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে ব্রি। এর আওতায় পাঁচ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, ব্রির পাঁচটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩০ টন মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ এবং প্রায় তিন হাজার কৃষক ও ৪২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে আধুনিক চাষাবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চল দেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ জোগান দেয়। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, জলবায়ু-সহিষ্ণু এই জাতটি ব্যাপকভাবে চাষ করা গেলে হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin