
বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে, অথচ বিনিময়ে তারা কোনো উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে আসছে না। প্রতি বছর সমুদ্রগামী জাহাজের ফ্রেইট বা মাশুল বাবদ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই বিদেশি মালিকানাধীন জাহাজ ও প্রতিষ্ঠানের পকেটে যাচ্ছে। এর বিপরীতে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের দখলে রয়েছে বাজারের মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ।
বুধবার ঢাকার মহাখালীস্থ ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশ বাড়াতে পারলে বছরে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার দেশে ধরে রাখা সম্ভব। ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন’ কার্যকর হওয়ার পর দেশীয় জাহাজের সংখ্যা ৪৮ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৮০টিতে উন্নীত হয়েছিল, যা দেশীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
সেমিনারে লজিস্টিকস খাতের বিদ্যমান নীতিমালা সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০১৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী লজিস্টিকস খাতে ৫১ শতাংশ দেশীয় ও ৪৯ শতাংশ বিদেশি মালিকানার সুযোগ রয়েছে। তবে এই নিয়ম সঠিকভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে বক্তারা অভিযোগ করেন। সিএসআর-এর পক্ষ থেকে দেশীয় মালিকানা বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ এবং বিদেশি অংশ সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশিদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধিত মূলধন এবং প্রকৃত প্রযুক্তি ও কারিগরি সরঞ্জামাদি বিনিয়োগের শর্ত জুড়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সিভিল এভিয়েশন আইন ২০১৭-এর আদলে এখানেও শক্তিশালী স্থানীয় খাত গড়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বলেন, বিদেশিরা বড় কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই লজিস্টিকস খাত থেকে বড় সুবিধা নিচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক ও বর্তমান সভাপতিরা জানান, বিদেশিরা কেবল কাগজ বিক্রির মাধ্যমে ডলার নিয়ে যাচ্ছে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম গ্লোবাল পলিটিক্স না বুঝে বিদেশিদের ঢালাওভাবে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
আইসিএবির সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দাপটে দেশীয় উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এ টি এম আজিজুল আকির ডেভিড স্থানীয় ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হারের সমালোচনা করে বলেন, ২৩-২৪ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. মুস্তফা কে মুজেরী, আলম মো. শহীদ খান, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহমুদ এবং হাসান মামুন।
আপনার মতামত লিখুন :