
দেশে গ্যাসের মজুত এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের ২২টি গ্যাস ক্ষেত্রে মজুত রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। ভূতাত্ত্বিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে বর্তমান মজুত দিয়ে মাত্র ১২ থেকে ১৩ বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় জ্বালানি খাতের বড় একটি অংশ এখন আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। বছরে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেও চাহিদার অর্ধেক পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্প খাতে গ্যাসের এই সংকট বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়। জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্পকারখানা আবেদন করে অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে ৫৫০টি কারখানা চার থেকে পাঁচ বছর আগেই ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে ভূখণ্ডে ৩০টি কূপ খনন করেও আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মাত্র ১২ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর উৎপাদন কমছে ১৩ কোটি ঘনফুট হারে। বর্তমানে দেশের ২২টি ক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়, কিন্তু সবকটি ক্ষেত্রের উৎপাদনই এখন নিম্নমুখী। তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে দৈনিক উৎপাদন ৫৪ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুটে নেমেছে। বাখরাবাদ ও সিলেট ক্ষেত্রের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা ক্ষেত্রে উৎপাদন ১২০ কোটি থেকে কমে ৭৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে। এছাড়া রূপগঞ্জের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে এবং সুন্দলপুর ক্ষেত্রের উৎপাদনও যেকোনো সময় বন্ধ হতে পারে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এই সরবরাহের মধ্যে ১১০ কোটি ঘনফুট আসছে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি সম্পন্ন হয়েছে। তবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা একে হতাশাজনক হিসেবে দেখছেন। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০২৭-২০২৮ সালে সরবরাহ ২৫৭ কোটি ঘনফুটে এবং ২০২৯ সালে ১৬০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ১৪০ কোটি ঘনফুটে নামতে পারে, যা শত শত শিল্পকারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে ফেলবে।
স্বল্পমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা কূপ খননের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। জ্বালানি বিভাগ মাতারবাড়ীতে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের জন্য চীনের প্রতিষ্ঠান সিএনইই-এর সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া মার্কিন কোম্পানি শেভরন ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে নতুন করে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকার এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০১৮ সালে ভোলায় মাঝারি আকারের ক্ষেত্র আবিষ্কারের পর দেশে আর বড় কোনো গ্যাস ক্ষেত্র মেলেনি, আর ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে পাইপলাইন না থাকায় ওই মজুতও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলা বলছে, ১৫০ কূপ খনন এবং তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানো গেলে ২০২৯ সালের শেষে বা ২০৩০ সালে ৩১৩ কোটি থেকে ৩৪৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া যাবে।
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন কোম্পানি শেভরন এক প্রস্তাবে বলেছে, মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) আছে। সেই চুক্তির আওতায় তারা নতুন করে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে (মূলত বৃহত্তর সিলেট এলাকায়) কাজ করার সুযোগ পেলে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন গ্যাস কাঠামোতে কূপ খনন করবে। এতে কয়েক বছরে আরও ৫ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কার সম্ভব। ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় কমবে ১৮০ কোটি ডলার। তবে সরকার এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :