Facebook Twitter Instagram YouTube

গভীর সংকটে দেশের আবাসন খাত, ফ্ল্যাট কেনাবেচায় বড় ধস


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৩, ২০২৬, ৮:০২ পূর্বাহ্ণ /
গভীর সংকটে দেশের আবাসন খাত, ফ্ল্যাট কেনাবেচায় বড় ধস

নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন বাজেটের করনীতির কারণে দেশের আবাসন খাত এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়েছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও আস্থা কমে যাওয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি ও বুকিং আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামালের লাগামহীন দামের চাপে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ থমকে গেছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আবাসন খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সারাদেশে মাত্র ৪১ হাজার ৮০৪টি ফ্ল্যাট হস্তান্তর চুক্তি বা দলিল নিবন্ধিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৯১৩টি ফ্ল্যাটই রাজধানীর। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে দেশজুড়ে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে কমে ১ লাখ ১২ হাজারে এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪ হাজারে নেমে আসে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ফ্ল্যাট নিবন্ধন ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৯.৬১ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় ৪২.৭৩ শতাংশ কমেছে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) নিপেন্দ্র নাথ সিকদার নিশ্চিত করেছেন যে, এই ধসের ফলে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

বিক্রি কমে যাওয়ায় ডেভেলপাররা জমির মালিকদের সঙ্গে যৌথ-উদ্যোগ চুক্তি করা কমিয়ে দিয়েছেন। ২০২৫ সালে প্রায় এক হাজার চুক্তি বাতিল হওয়ার পর, চলতি বছরের প্রথমার্ধে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। ক্রেতাদের অর্থ পরিশোধ করেও ফ্ল্যাট না পাওয়ার অভিযোগের সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান শেলটেক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাদের বুকিং বাতিল হয়েছে ২৫ শতাংশ এবং নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। তবে রূপায়ণ অ্যাসেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন খান জানিয়েছেন, তাদের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে এবং বর্তমানে কোনো প্রকল্প বন্ধ নেই।

নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ২০২০ সালের মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। বর্তমানে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট ৫২০ থেকে ৫৮০ টাকায় এবং প্রতি টন এমএস রড গ্রেডভেদে ৮৫,০০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেএসআরএম গ্রুপের পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া ও আমদানি খরচ বৃদ্ধিতে কাঁচামাল সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এর ওপর নতুন বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রক শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এছাড়া গৃহঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে ওঠায় মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। মগবাজারের একটি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, ৪৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২২টির চুক্তি হলেও বাকি ২৬টি বিক্রি করতে না পারায় ওই প্রকল্পের কাজ তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের পর বন্ধ হয়ে গেছে।

আর্থিক চাপের কারণে আবাসন খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২২ সালের ৭-৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৬.৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই খাতের স্থবিরতায় ইস্পাত উৎপাদকরা গত তিন মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং সিমেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল জানান, নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ এবং কাঁচামালের শুল্ক বৃদ্ধি সংকটকে তীব্র করেছে। আগে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা গেলেও এখন তার নির্মাণ ব্যয়ই দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এই সংকট উত্তরণে রিহ্যাব ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ এবং ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামোর দাবি জানিয়েছে।

মাঝারি ও ছোট ডেভেলপারদের অবস্থা: অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ধেকের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পেরে ব্যাংক ঋণের আশায় নিজেদের অংশ বন্ধক রেখে প্রকল্প সচল রাখার চেষ্টা করছে। শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা স্টিল ও সিমেন্টের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার স্থানীয় উৎপাদকরাও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আগে যেখানে বছরে ৭ থেকে ৮টি প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা যেতো, সেখানে এখন মাত্র তিনটি প্রকল্প শেষ করতে পেরেছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধীরগতির পরও রূপায়ণ অ্যাসেট লিমিটেড এ বছর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন খান বলেন, বছরের শুরু থেকে আমাদের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে এবং বর্তমানে কোনো প্রকল্প বন্ধ নেই।

রিহ্যাবের দাবি: রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারি মূল্যের ওপর নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা এবং কাঁচামালের শুল্ক বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা যেতো, এখন তার নির্মাণ ব্যয়ই দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এই সংকট থেকে আবাসন খাতকে বাঁচাতে সরকারের কাছে দ্রুত নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। এর মধ্যে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন, মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়নের জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin