
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচারিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ব্যর্থতার ফলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আইনের শাসন দুর্বল হচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অভিযোগে কারাবন্দি করা এবং অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে তারা।
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্র দাখিলের পর এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে হওয়া নিপীড়নের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি হলেও, বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ার অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ। তিনি নতুন সরকারকে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও মনগড়া অভিযোগের মাধ্যমে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে, যেখানে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এইচআরডব্লিউর দাবি, ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধনের পরেও বিদ্যমান আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। তারা স্পষ্ট প্রমাণের অভাব থাকা সত্ত্বেও প্রসিকিউশনের গ্রেফতার চাওয়া, লিখিত কারণ ছাড়া আটক রাখা এবং বিচারের আগে আপিলের সুযোগ না থাকার মতো বিষয়গুলোতে সমালোচনা করেছে। এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং জেরা চলাকালে আইনজীবীদের ওপর বিধিনিষেধের বিষয়গুলোও তাদের বিবৃতিতে উঠে এসেছে।
বিবৃতিতে গত ১৪ মে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাদের আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী প্রসিকিউশন গ্রেফতারের লিখিত কারণ জানায়নি। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি, কারণ আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার জন্য নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যের প্রমাণ প্রয়োজন। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ২২ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার ক্ষেত্রেও সাক্ষ্যবিবরণীতে অভিন্ন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ এনেছে এইচআরডব্লিউ, যা প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। পাশাপাশি এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার বিনিময়ে জামিনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তারা তুলে ধরেছে। যদিও অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেছেন, তবে প্রধান প্রসিকিউটরের দফতর এখনও তদন্ত শেষ করেনি। আগামী ৬ আগস্ট মামলার বিচার শুরুর কথা রয়েছে।
সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অতীতেও রাজনৈতিক পক্ষপাত ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতির অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
বিবৃতিতে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় গত ১৪ মে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার গ্রেফতারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এইচআরডব্লিউর দাবি, তাদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের বিধান অনুযায়ী গ্রেফতারের লিখিত কারণ প্রসিকিউশন দেয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :