Facebook Twitter Instagram YouTube

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও উত্তরণের উপায়


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ /
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও উত্তরণের উপায়

পানি পৃথিবীর সব প্রাণের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। এটি কেবল জীবনের মৌলিক চাহিদা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট আজ এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ অঞ্চলে পানির কোনো অভাব নেই; নদী, নালা, খাল এবং সাগরের সীমানায় ঘিরে থাকা এক সুবিশাল জলাভূমি এটি। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর বৈপরীত্যে চারদিকে অপার পানির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও এক ফোঁটা পানযোগ্য মিষ্ট পানি পাওয়ার জন্য উপকূলের মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের মানুষের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা হলো—চারদিকে পানি, অথচ এক ফোঁটাও পানের যোগ্য নয়।

বছরের পর বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে এক কলসি নিরাপদ পানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এই ভোগান্তির শিকার সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশুরা। ভোর না হতেই পানির পাত্র কাঁখে নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা উপকূলীয় জীবনের এক করুণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। পানির জন্য এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল শারীরিক কষ্টই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় নারী ও শিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এক নীরব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে পানির এই ভয়াবহ সংকট কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত রূপান্তর এবং মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের এক জটিল সম্মিলিত ফল। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাবে জোয়ারের সময় সাগরের লবণাক্ত পানি নদী ও নালা বেয়ে দেশের ভেতরের ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। এছাড়া অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে সুপেয় পানির স্তরে লোনা পানি প্রবেশ করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, হাজার ফুট গভীর নলকূপ বসিয়েও প্রয়োজনীয় মিষ্ট পানির সন্ধান মিলছে না। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী খরা, বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন পরিবর্তন, খাল-বিল ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় নদীর স্বাভাবিক নিম্নমুখী চাপ কমে গিয়ে লোনা পানি আরও ওপরের দিকে উঠে আসছে।

সুপেয় পানির অভাব গোটা উপকূলীয় জীবনযাত্রাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত লবণাক্ত বা দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ডায়রিয়া, চর্মরোগ, পাকস্থলীর সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভপাত ও কিডনি জটিলতার মতো নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে আবাদী জমিতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ মাটির উর্বরতা কমিয়ে ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত করছে, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এছাড়া কৃষি ও সুপেয় পানির অভাবে অনেক পরিবার গৃহপালিত পশু পালন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং জীবিকার তাগিদে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ক্রমাগত লোকজন বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে, যা নতুন এক পরিবেশগত শরণার্থীর জন্ম দিচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় আধুনিক ডেসালিনেশন প্রযুক্তি যেমন রিভার্স অসমোসিস ব্যবহার করে নদীর পানি থেকে লবণ ও ক্ষতিকর উপাদান অপসারণ করা কার্যকর হতে পারে। উপকূলের দুর্গম অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎচালিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি বিতরণ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ও স্থানীয় প্রযুক্তির সমন্বয় জরুরি। এর মধ্যে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সংরক্ষিত মিষ্ট পানির পুকুর ও জলাধার তৈরি, খাল ও নদী পুনঃখনন এবং কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টির পানিকে ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির স্তরে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি প্রয়োগ অন্যতম।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে জাতীয় পানি নীতিমালা ১৯৯৯ প্রণয়ন করা হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পানি নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষে পানি নীতিমালার প্রধান বিষয়গুলো হলো: ১. পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ২. পানি সংকটাপন্ন এলাকার সীমানা নির্ধারণ, ৩. সুরক্ষা আদেশ দ্বারা বিধি-নিষেধ আরোপ। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ এবং পানিসম্পদ পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ আইন, ২০২৫-এর খসড়া প্রণয়নের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ পানি আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী পানি সংকটাপন্ন এলাকার সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে জলাধার বা পানি ধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা, নিরীক্ষা ও জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ২৮ অক্টোবর ২০২৫ সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিছু অঞ্চলকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে উচ্চ বিনিয়োগ, নদীর পানির গুণগত মানের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত ঝুঁকির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইসিডিডিআর.বি ও ইম্পোরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় উপকূলের খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত ও অংশগ্রহণে সমর্থিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পানি কেবল পণ্য নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার। মাস্টারপ্ল্যান, জলবায়ু অভিযোজন তহবিলের সঠিক ব্যবহার এবং সর্বস্তরের মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে উপকূলের তৃষ্ণার্ত হাহাকার দূর করা সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সংকটাপন্ন উপকূল রেখে যেতে হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh