Facebook Twitter Instagram YouTube

ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে ১২২ কোটি টাকা গচ্চা, ফের চালুর উদ্যোগ


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৮, ২০২৬, ৩:৩৭ অপরাহ্ণ /
ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে ১২২ কোটি টাকা গচ্চা, ফের চালুর উদ্যোগ

রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ-নদী নিয়ে ১১০ কিলোমিটারের বৃত্তাকার নৌপথ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘদিনের। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা, অথচ বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রকল্পটির ব্যর্থতার নজির হিসেবে সদরঘাটে পড়ে থাকা ওয়াটার বাস এবং বিভিন্ন স্থানে ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোর বেহাল দশাকে তুলে ধরা যায়। আমিনবাজার সেতুর গাবতলী অংশের পাশে তুরাগ নদের তীরে নির্মিত ল্যান্ডিং স্টেশনগুলো এখন যেন ‘ভূতের বাড়ি’। দোতলা ভবন, পন্টুন ও পন্টুনে যাওয়ার সিঁড়ি থাকলেও সেখানে বহুদিন নৌযান থামেনি। সেবাটি মূলত ২০১৬ সালের দিকেই চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইপি সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে বৃত্তাকার নৌপথ চালু ও নৌযান নামাতে প্রথম প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে এই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাময়িকীতে ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘ঢাকার বৃত্তাকার নৌপরিবহনব্যবস্থা: বর্তমান অবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ’ শিরোনামের গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সাড়ে ২৯ কিলোমিটার নৌপথ খনন এবং ১০টি ল্যান্ডিং স্টেশন ও ৭টি টার্মিনাল ভবনসহ অবকাঠামো তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সাড়ে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় ধাপে আশুলিয়া থেকে টঙ্গী হয়ে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার নৌপথ উন্নয়নের কাজ করা হয়। এছাড়া বিআইডব্লিউটিসি সূত্র বলছে, ওয়াটার বাস কেনা ও পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা।

পুরো ১১০ কিলোমিটার পথে সেবাটি কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি, যার অন্যতম কারণ হলো নৌপথের ওপর থাকা নিচু সেতু। বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে থাকা ২৫টি সড়কসেতু ও ৩টি রেলসেতুর মধ্যে ২০টিরই উচ্চতা কম, যা বড় নৌযান চলাচলের জন্য বড় বাধা। পুরো পথে সেবা চালু করতে হলে অনেক সেতু ভেঙে ফেলার প্রয়োজন পড়বে।

ওয়াটার বাস সেবার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৪ সালে আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পথে দুটি ছোট লঞ্চ দিয়ে প্রথম ‘ওয়াটার বাস’ সেবা উদ্বোধন করা হয়, যা কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে ‘এমভি বুড়িগঙ্গা’ ও ‘এমভি তুরাগ’ নামে দুটি ওয়াটার বাস নামানো হয়। এরপর ২০১৪ সালে দুই ধাপে আরও ১০টি ওয়াটার বাস নামানো হয়। সব মিলিয়ে ১২টি ওয়াটার বাস নামানো হয়েছিল। ২০১৪ সালের শেষ দিকে দুটি ওয়াটার বাস গাবতলী–সদরঘাট রুট থেকে সরিয়ে টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ নৌপথে নেওয়া হয়, যা বছরখানেকের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়।

যাত্রীদের অনীহা ও নদীদূষণের কারণেও এই সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। যাত্রীরা জানিয়েছেন, ওয়াটার বাসে যাতায়াত করলেও চালকদের অনিয়ম ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে ভোগান্তি পোহাতে হতো। গাবতলী ঘাটে ২০ বছর ধরে কর্মরত লস্কর মো. বাবুল জানান, যাত্রীর অভাব না থাকলেও চালকদের খুঁজে পাওয়া যেত না। ২০১৬ সালে লোকসানের মুখে ‘বুড়িগঙ্গা’ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারাও ব্যর্থ হয়। ২০২০ সালে কেরানীগঞ্জ–বুড়িগঙ্গা নৌকা মাঝি শ্রমিক শ্রমজীবী সমবায় সমিতিকে ছয় মাসের জন্য আটটি ওয়াটার বাস ইজারা দেওয়া হয়, তারাও লোকসানের পর সেগুলো ফিরিয়ে দেয়।

বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসি ১২টি ওয়াটার বাসের মধ্যে ৯টি পুরোনো লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। বাদামতলী ঘাটে পাঁচটি ওয়াটার বাস জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে, যেগুলোর জানালা ভাঙা ও আসন চুরি হয়ে গেছে। বাকি চারটি ওয়াটার বাসের মধ্যে দুটি নারায়ণগঞ্জ ও দুটি চট্টগ্রামে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, ফিটনেস না থাকায় এগুলো পরিত্যক্ত এবং নিলামে বিক্রি করা হবে। বাকি তিনটি আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে চলছে।

তবে গত ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নদীপথ সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, এবার আর বিআইডব্লিউটিসি নয়, বরং আগ্রহী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার জানান, নদীদূষণ ঠেকাতে পারলে ও প্রচার বাড়াতে পারলে এই প্রকল্প সফল করা সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ছাড়া তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে আবারও অর্থের অপচয় হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে ধাপে ধাপে এগোলে তবেই বৃত্তাকার নৌপথের সুফল পাওয়া সম্ভব।

২০১৭ সালে বিআইডব্লিউটিসি গঠিত একটি কমিটি বুড়িগঙ্গার পানি দুর্গন্ধমুক্ত করা, ঘাটে যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর উভয় পাড়ে হাঁটার পথ নির্মাণ, ওয়াটার বাসে পর্যাপ্ত লাইট–ফ্যান ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল।.যাত্রীরা কেউ কেউ ভিন্ন কথাও বলছেন।

ব্যক্তির ইচ্ছায় কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন কেনা হয়েছিল।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo