
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নতির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি অনেকাংশে নির্ভর করে দেশের মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর। জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই কর্মসংস্থানে নারীদের পিছিয়ে থাকা কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক দশকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারীদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও পেশাগত ক্ষেত্রে তারা এখনও নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
নারীদের কর্মসংস্থানের পথে প্রধান বাধাগুলোর অন্যতম হলো দীর্ঘদিনের প্রচলিত সামাজিক মানসিকতা। অনেক পরিবারে আজও বিশ্বাস করা হয় যে, নারীর মূল দায়িত্ব সংসার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালন করা। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও অনেক নারী কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন না অথবা মাতৃত্বের পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সব নারীর জন্য সমান নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মেয়েরা প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও আধুনিক দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমান চাকরির বাজারে ডিজিটাল দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম, যেখানে বৈষম্য থাকলে নারীদের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়।
নিয়োগের ক্ষেত্রেও নারীরা পক্ষপাতিত্বের শিকার হন। অনেক নিয়োগকর্তা মনে করেন, পারিবারিক দায়িত্বের কারণে নারীরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারবেন না বা মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। একই যোগ্যতার নারী ও পুরুষ প্রার্থীর মধ্যে অনেক সময় পুরুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা কর্মক্ষেত্রে অদৃশ্য বাধা তৈরি করে। এছাড়া কর্মস্থলে নিরাপত্তা, যৌন হয়রানির আশঙ্কা এবং দূরপাল্লার বা রাতের শিফটের কাজে সীমাবদ্ধতা নারীদের কর্মসংস্থানকে ব্যাহত করছে।
কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও নারীরা পদোন্নতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে 'গ্লাস সিলিং' বা অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন হন। পারিবারিক দায়িত্বের অসম বণ্টনের কারণে কর্মজীবী নারীরা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েন, যা তাদের কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্বাস্থ্যসেবা ও উদ্যোক্তা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রবণতা আশাব্যঞ্জক।
নারীর সমান কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। পরিবারে গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব ভাগাভাগি করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, মাতৃত্বকালীন ও প্রয়োজনে পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিশুযত্ন কেন্দ্রের মতো সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাভিত্তিক নীতি অনুসরণ এবং নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ ও সমান সুযোগ প্রদান করা হলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
আপনার মতামত লিখুন :